Warning: session_set_cookie_params(): Cannot change session cookie parameters when session is active in /home/kajkhuji/public_html/includes/theme/head.php on line 2
KajKhuji - বাংলা- লেকচার-২১-১: বাংলা ব্যাকরণ (শব্দ)

Share:

ভাষার অন্যতম মৌলিক উপাদান শব্দ। বিশেষ বা স্বতন্ত্র পদার্থ বা ভাবকে প্রকাশ করে, মানব-মুখনিঃসৃত এমন একটি ধ্বনিকে বা একাধিক ধ্বনির সমষ্টিকে শব্দ বলে। এক বা একাধিক ধ্বনির অবলম্বনে শব্দের সৃষ্টি হয়। যেমন: এ, এই, শোন, মা, কে, তুই, চাঁদ, হাত, আলো ইত্যাদি। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, "অর্থবোধক ধ্বনি বা ধ্বনি সমষ্টিকে শব্দ বলে।" ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, " অর্থবোধক ধ্বনিকে শব্দ বলে। কোন বিশেষ সমাজের নরনারীর কাছে যে ধ্বনির স্পষ্ট অর্থ আছে, সেই অর্থবোধক ধ্বনিই হচ্ছে, সেই সমাজের নরনারীর ভাষার শব্দ।"

অশোক মুখোপাধ্যায়ের মতে, "এক বা একাধিক ধ্বনির সমন্বয়ে তৈরী অর্থবোধক ও উচ্চারণযোগ্য একককে শব্দ বলা হয়।"

ধ্বনির স্পষ্ট অর্থ না থাকলে ব্যকরণের নিয়মে তা শব্দ বলে বিবেচিত হয় না। কথাবার্তায় মানুষ শব্দ ব্যবহার করে মনের ভাব প্রকাশ করে। তাই বেশি সংখ্যক শব্দ জানা থাকলে সুন্দর ও সহজ ভাবে অপরের কাছে মনোভাব প্রকাশ করা সম্ভব হয়। একই শব্দে আবার অনেকগুলো প্রতিশব্দ থাকে। বক্তব্য প্রকাশের সময় বেছে বেছে শব্দ চয়ন করতে হয়।

যে ভাষার শব্দভান্ডার যতো বেশি সমৃদ্ধ সে ভাষা ততো উন্নত। ভাষা ব্যবহারের মাধ্যেমে শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হয়। প্রতিটি জীবন্ত ভাষার রয়েছে অসংখ্য শব্দ। ভাষা-বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিটি জীবন ভাষা দৈনন্দিন জীবন থেকে স্বাভাবিক নিয়মে আহরণ করে নতুন নতুন শব্দ। এ সব শব্দ পুরনো শব্দের সঙ্গে ভাষায় ব্যবহৃত হয়। এছাড়া যে কোন ভাষার সৃজনশীল কবি সাহিত্যিকগণ তাঁদের রচনায় নতুন নতুন শব্দ সৃজন করে নিজস্ব ভাষাশৈলী গঠন করেন, পরবর্তীকালে ঐ সকল শব্দ ভাষা ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের ব্যবহৃত শব্দের অর্ন্তভূক্ত হয়ে যায়। নতুন ভাষা সৃজন মুহূর্তেও কোন ভাষার শব্দ অন্য ভাষায় কখনও সরাসরি কখনও পরিবর্তিত রূপে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন: ইংরেজি ভাষার অনেক শব্দই ফারসি ও জার্মান, ল্যাটিন ভাষা থেকে গৃহীত হয়েছে। বাংলা ভাষায় সংস্কৃত, আরবি, ফারসি ও ইংরেজি ভাষা থেকে এসেছে অনেক শব্দ। এভাবে ভাষার ভান্ডারে নিত্য-নতুন শব্দের জন্ম হয়।

আমাদের বাংলা ভাষাও দেশী-বিদেশী অসংখ্য শব্দ আহরণ করে সমৃদ্ধশালী ভাষার পরিণত হয়েছে। ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষাগোষ্ঠীর প্রাচীন ভারতীয় আর্য শাখার ক্রম বিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষা বর্তমানে রূপ লাভ করেছে। তাই এ ভাষায় দেশী-বিদেশী অসংখ্য শব্দের উপস্থিতি বিদ্যমান। আর্যরা এদেশে আগমনের পূর্বে যেসব আদিম অধিবাসি এখানে বসবাস করত তারাও কিছু শব্দ দান করেছে। বিদেশীরা ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্ম প্রচার, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময়ে এদেশে এসেছে এবং বসবাস করেছে। তাদের ভাষার শব্দ সমূহ এদেশের ভাষার ওপর প্রভাব ফেলেছে। এভাবে মৌচাকে মধু সঞ্চয়ের পদ্ধতিতে, বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ সম্ভার গৃহীত হয়ে গড়ে উঠেছে সমৃদ্ধশালী বাংলা ভাষা। বিভিন্ন ভাষার প্রচুর শব্দ বাংলা ভাষার সাথে এমন ঘনিষ্ঠভাবে মিশে গিয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর পরিচয় বের করাও কষ্টকর হয়ে পরে।

■ ধ্বনি ও শব্দের মধ্যে পার্থক্য

ধ্বনি ও শব্দের মধ্যে পার্থক্য সমূহ নিম্নরূপ:

ধ্বনি শব্দ
১. মানুষের মুখ থেকে নিঃসৃত শব্দের ক্ষুদ্রতম অংশের নাম ধ্বনি। ১. এক বা একাধিক অর্থপূর্ণ ধ্বনি মিলে তৈরী হয় শব্দ।
২. ধ্বনি তৈরী হতে বাগযন্ত্রের সাহায্য লাগে। ২. বাগযন্ত্রের সাহায্য ছাড়াও শব্দ তৈরী হতে পারে।
৩. ধ্বনির লিখিত রূপের নাম বর্ণ। ৩. একাধিক বর্ণের মিলনে গঠিত হয় শব্দ।
৪. একাধিক ধ্বনি একত্রে মিলে তৈরী হয় শব্দ। ৪. শব্দকে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় ধ্বনি।
৫. ধ্বনি উচ্চারিত হলে তা কেবল শ্রুতিগোচর। ৫. শব্দ উচ্চারিত হলে তা শ্রুতিগোচর ও শব্দের লিখিত রূপ দৃশ্যগোচর।

■ শব্দের শ্রেণীবিভাগ

বাংলা ভাষার শব্দ সম্ভারকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন: ক. উৎস বা উৎপত্তি অনুসারে শব্দের শ্রেণীবিভাগ, খ. অর্থানুসারে শব্দের শ্রেণীবিভাগ এবং গ. গঠন অনুসারে শব্দের শ্রেণীবিভাগ।

■ উৎস বা উৎপত্তি অনুসারে শব্দের শ্রেণীবিভাগ

উৎপত্তিগত দিক থেকে বাংলা ভাষার শব্দসমূহকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন:

১. তৎসম শব্দঃ 'তৎ' অর্থ তার (সংস্কৃতের) আর 'সম' অর্থ সমান। অর্থাৎ 'তৎসম' শব্দটির অর্থ হলো সংস্কৃতের সমান। যেসব সংস্কৃত শব্দ কোন প্রকার বিকৃত না হয়ে বাংলা ভাষায় প্রচলিত হয়ে আসছে, সেগুলোকে তৎসম শব্দ বলে। ড. হুমায়ুন আজাদের মতে, "প্রাচীন ভারতীয় আর্য বা সংস্কৃত ভাষার বেশ কিছু শব্দ বেশ অটল-অবিচল। তারা বদলাতে চায় না। শতকের পর শতক তারা অক্ষয় হয়ে থাকে। এমন বহু শব্দ, অকষর অবিনশ্বর শব্দ, এসেছে বাংলায়। এগুলোকে বলা হয় তৎসম শব্দ।"

তৎসম শব্দ গাম্ভীরর্যপূর্ণ। তাই গুরুগম্ভীর ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে খুবই উপযোগী। প্রচীনকাল থেকে এদেশের সাহিত্য, ধর্ম, দর্শন ইত্যাদি সংস্কৃত ভাষয় চলতে থাকায় বাংলা ভাষার প্রয়োজন মত বহু সংস্কৃত শব্দ গ্রহন করেছে। দেশের খ্যাতনামা পন্ডিতদের মতে বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দের প্রচলন রয়েছে শতকরা পঁচিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মত। যেমন: চন্দ্র, মস্তক, গৃহিণী, পঙ্কজ, পত্র, নক্ষত্র, বৃক্ষ, মৃত্যু, অঞ্চল, হস্ত, চরণ, সূর্য, মনুষ্য, ভক্তি, আতিথ্য, মঞ্জুর, গমন, ফল, ফুল, লতা, ধর্ম, কর্ম, লাভ, ক্ষতি, শয়ন, গমন, ভোজন, সিংহ, লবণ, দ-, জিহ্বা, চর্ম, অদ্য, পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগিনী, নীর, নারী, ব্যক্তি, দস্যু, দাস, সভা, শ্বশুর, ধন, ঋণ, বন্ধু, আগমন, শক্তি, মুক্তি, জয়, পরাজয়, সন্ধ্যা, পুষ্প, কৃষ্ণ, নিমন্ত্রণ, শ্রাদ্ধ, স্পর্শ, ঘর্ষণ, জ্ঞান, জ্ঞাপন, যত্ন, রত্ন, জ্যোৎস্না, তমশা, কর্ণ, কান্না, বৎস, কাক, কল্য, কাংস্য, কঙ্কন, কেশর, শরীর, জন্ম, পর্বত, রাত্রি, জীবিকা, শয়ন, চক্ষু, জনক, সাগর, প্রবেশ, গগন, জলধি, ছাত্র, শিক্ষা, রাজা, মানব, বৎস, সন্তান, জননী, স্মৃতি, নদ, নদী, পদ্ম, প্রশ্ন, নৃত্য, বর্ষা, গ্রাম, বন, কন্যা, অস্ত্র, রণ, যুদ্ধ, জীবন, অমৃত, রবি, শশী, প্রস্তুত, পথ, ভূমি, সঞ্চয়, সমর, নতুন, নির্গমন, সিন্ধু, ঢাল, তাপস, জল, বণিক, ব্রাক্ষণ, নৌকা, কৃপণ, ক্ষমতা, ক্ষমা, দীক্ষিত, বধূ, পণ, প্রস্থান ইত্যাদি।

তত্‍সম শব্দের মনে রাখার কৌশল:

হস্তে যদি থাকে শক্তি - চন্দ্র সূর্য করবে ভক্তি।

ভবনের পত্র ধর্ম - লাভ ক্ষতি মনুষ্য পর্বতের কর্ম।

সন্ধ্যায় করোনা ভোজন, শয়ন, গমণ।

২. অর্ধ-তৎসম শব্দঃ যেসব শব্দ বাংলা ভাষায় মূল সংস্কৃত শব্দরূপে অবিকৃত নেই; অথচ পূর্ণ তদ্ভব রূপও প্রাপত হয়নি, লোকের মুখে শৃঙ্খলাহীনভাবে ভেঙ্গে খুব সহজে উচ্চারিত হয়, সেগুলোকে অর্ধ-তৎসম শব্দ বলা হয়। 'কৃষ্ণ' একটি সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ। এটি প্রকৃত বা অপভ্রংশের মধ্য দিয়ে বাংলায় তদ্ভবশব্দরূপে কান্হাই, কানাই বা কানু রূপে গৃহীত হয়েছে। কিন্তু এটি আবার লোক মুখে বিকৃত হয়ে অর্ধ-তৎসম শব্দ কেষ্ট হয়ে যায়। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত শতকরা ৫ ভাগশব্দই অর্ধ-তৎসম শব্দ। যেমন: গতর (তৎসম- গাত্র, তদ্ভব-গা), নেমন্তন্ন (তৎসম-নিমন্ত্রণ), ছেরাদ্দ (তৎসম-শ্রাদ্ধ), বেরাক্ষণ (তৎসম-ব্রাক্ষণ), আদা (তৎসম-আদ্রক), ক্ষিদে (তৎসম-ক্ষুধা), গিন্নী (তৎসম-গৃহিণী), মচ্ছব (তৎসম-মহোৎসব), পুরুত (তৎসম-পুরোহিত), বোষ্টম (তৎসম-বৈষ্ণব), মাগগী (তৎসম-মহার্ঘ), আঁধার (তৎসম-অন্ধকার), হাঁস (তৎসম-হংস), কুমার (তৎসম-কুম্ভকার), কামার (তৎসম-কর্মকার), সোনা (তৎসম-স্বর্ণ), লোহা (তৎসম-লৌহ), চোখ (তৎসম-চক্ষু),জোছনা (তৎসম-জ্যোৎ¯œা),ঘেন্না (তৎসম-ঘৃণা), পেন্নাম (তৎসম-প্রণাম), ছাতা (তৎসম-ছত্র), গাধা (তৎসম-গর্দভ), সত্যি (তৎসম-সত্য), গেরস্থ (তৎসম-গৃহস্থ), যতন (তৎসম-য়ত্ন), চামার (তৎসম-চর্মকার), রাত্রির (তৎসম-রাত্রি), বিষ্টি (তৎসম-বৃষ্টি), সূয্যি (তৎসম-সূর্য), গতর (তৎসম-গাত্র), মিষ্টি (তৎসম-মিষ্ট), রতন (তৎসম-রত্ন), রোদ্দুর (তৎসম-রৌদ্র), বিচ্ছির (তৎসম-বিশ্রী), পিঠ (তৎসম-পৃষ্ট), কুচ্ছিত (তৎসম-কুৎসিত), কিচ্ছু (তৎসম-কিছু), বাতি (তৎসম-বার্তিকা), সোয়াদ (তৎসম-স্বাদ), মন্তর (তৎসম-মন্ত্র), সক্কল (তৎসম-সকল), প্ররান (তৎসম-প্রাণ), পরশ (তৎসম-স্পর্শ), পীরিত (তৎসম-প্রীতি), তেষ্টা (তৎসম-তৃষ্ণা), বাদ্যি (তৎসম-বাদ্য) ইত্যাদি।

৩. তদ্ভব শব্দঃ যেসব শব্দ মূল সংস্কৃত অথচ কালক্রমে প্রকৃত ভাষার মধ্যে পড়ে লোকের মুখে বিকৃতপ্রাপ্ত হয়ে রূপ পরিবর্তিত হয়েছে, সেগুলোকে তদ্ভব শব্দ বলে। মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতে, "যেসব শব্দ মূল সংস্কৃত ভাষায় পাওয়া যায়, কিন্তু ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনের ধারায় প্রাকৃতির মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে আধুনিক বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে, সেসব শব্দকে বলা হয় তদ্ভব শব্দ।"

তদ্ভব কথাটির অর্থ তৎ (তা) থেকে ভব (উৎপন্ন) , অর্থাৎ সংস্কৃত শব্দ থেকে উৎপন্ন। বাংলা ভাষা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাকৃত ভাষার মাধ্যমে এগুলো গ্রহন করেছে। ড, এনামুল হকের মতে খ্যাতনামা লেখকদের রচনায় শতকরা ষাট ভাগই তদ্ভব শ্রেণীর অর্ন্তগত। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যাবতীয় নাম, পেশাবাচক শব্দ, পশু-পাখি ও প্রাকৃতিক বস্তুর নাম, ঘর-সংসারের জিনিসপত্র, সংখ্যাবাচক শব্দ, তারিখ, ক্রিয়াবাচক শব্দ, অব্যয় ইত্যাদি অসংখ্য শব্দ তদ্ভব শ্রেণীভূক্ত। এ শব্দগুলো বর্ণবিন্যাসে, বাহ্য আকৃতিতে, উচ্চারণে এবং অনেক ক্ষেত্রে অর্থের দিক থেকে এমনভাবে বিকৃতি প্রাপ্ত হয়েছে যে এগুলো এখন আর সংস্কৃত শব্দ বলে মনে হয় না। যেমন: কর্ণ সংস্কৃত শব্দের প্রকৃত রূপ হচ্ছে কন্ন। এ 'কন্ন' শব্দ থেকেই 'কান' তদ্ভব শব্দের উৎপত্তি ঘটেছে। নিচে তদ্ভব শব্দের পরিবর্তন ধারার কতিপয় নমুনা দেওয়া হল ঃ

সংস্কৃত ˃ প্রাকৃত ˃ বাংলা (তদ্ভব) সংস্কৃত ˃ প্রাকৃত ˃ বাংলা (তদ্ভব) সংস্কৃত ˃ প্রাকৃত ˃ বাংলা (তদ্ভব)

সন্ধ্যা ˃ সঞ্চা ˃ সাঁঝ

মৃত্তিকা ˃ মিত্তিকা ˃ মাটি

ঘটিকা ˃ ঘডিআ ˃ ঘড়ি

চন্দ্র ˃ চন্দ্র ˃ চাঁদ

দধি ˃ দহি ˃ দই

বক্ষঃ ˃ বুক্খ ˃ বুক

হস্ত ˃ হথ ˃ হাত

ভ্রান্ত ˃ ভুল্ল ˃ ভুল

বঙ্ক ˃ বংক ˃ বাঁক

অদ্য ˃ অজ্জ ˃ আজ

পাদ ˃ পাতা ˃ পা

ঘাত ˃ ঘাঅ ˃ ঘা

সর্ব ˃ সব ˃ সব

পত্র ˃ পত্ত ˃ পাত

তক্ক ˃ টঙ্কা ˃ টাকা

মাতা ˃ মাআ ˃ মা

সন্তার ˃ সংতার ˃ সাঁতার

অঞ্চল ˃ অংচল ˃ আঁচল

ঘিত ˃ ঘিঅ ˃ ঘি

ভদ্র ˃ ভল্ল ˃ ভাল

বাটী ˃ বাড়ী ˃ বাড়ি

চলিত ˃ চলই ˃ চলে

বধূ ˃ বহু ˃ বউ

সীতা ˃ সীথা ˃ সিঁথি

দ-˃ দান্ত ˃ দাঁত

গাত্র ˃ গাআ ˃ গা

অর্ধ ˃ অদ্ধ ˃ আধ

কার্য ˃ কজ্জ ˃ কাজ

পাষাণ ˃ পাবন˃ পাহাড়

গট্ট ˃ ঘট্ট ˃ ঘাট

সখি ˃ সহি ˃ সই

চক্র ˃ চক ˃ চাক

বৃদ্ধ ˃ বুড্ড ˃ বুড়া

অক্ষি ˃ অক্খি ˃ আঁখি

অভ্যন্তর˃ ভীতর ˃ ভিতর

সন্ধ্যা ˃ সঞ্ঝা ˃ সাঁঝ

কর্ণ ˃ কন্ন ˃ কান

কার্য ˃ কজ্জ ˃ কাজ

নৃত্য ˃ নাচ্চা ˃ নাচ

মৎস্য ˃ মচ্ছ ˃ মাছ

মাতৃ ˃ মাই ˃ মা

মধু ˃ মহু ˃ মৌ

ভক্ত ˃ ভত্ত ˃ ভাত

সর্ব ˃ সব্ব ˃ সব

তৈল ˃ তেল্ল ˃ তেল

অর্ধ তত্‍সম শব্দের মনে রাখার কৌশল:

গিন্নী মাগি জোছনা কুচ্ছিত গতরে - বোস্টমের বাড়িতে নেমন্তন খেতে যান।

পুরুত ও কেষ্ট খিদে পেয়ে শুধু আদা খান।

তদ্ভব শব্দের কিছু উদাহরণঃ গোয়াল, গরু, ঘোড়া, উট, হাতি, গাধা, সাপ, সোনা, রুপা, আম, ছাতা, লাঠি, বাতি, হাত, পা, চোখ, কান, এক, দুই, তিন, পোয়া, সাড়ে, দেড়, আধ, মা, বাপ, ভাই, বোন, মামা, জ্যাঠা, কামার, বাঁদর, ভাত, ভাপ, মেয়ে, মড়ক, মাস, রাখাল. শিউলি, কুমার, পয়লা, দোসরা, পাঁচই, আমি, তুমি, তিনি, চলে, হয়, নাচে, কাল, ভালো, হালকা, পাতলা, বাছুর, বাঁঝা (বাঁজা), আজ, আলতা, আটপৌরে, দেউলিয়া, দেউটি, উনুন, এয়ো, ওঝা, চিড়া, ছুতা, ছাতা, জট, ঝি ইত্যাদি।

৪. খাঁটি বাংলা শব্দ বা দেশী শব্দঃ যেসব শব্দ অতি প্রাচীনকাল হতেই এদেশে প্রচলিত হয়ে আসছে, আর্য সভ্যতার প্রভাবে লোপ পায় নি বা বিকৃত ঘটে নি, বর্তমান সময়ের প্রচলিত আছে, সেগুলোকে দেশী শব্দ বলে। যেসব শব্দ দ্রাবিড়, কোন অথবা এদেশের আদিম অধিবাসী অর্নাযদের ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় স্থান লাভ করেছে সেগুলোকে খাঁটি বাংলা শব্দ বা দেশী শব্দ বলে।

খাঁটি বাংলা শব্দ বা দেশী শব্দ সম্পর্কে মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বলেছেন, "বাংলাদেশের আদিম অধিবাসীদের যেমন: কোল, মুন্ডা প্রভৃতি ভাষা ও সংস্কৃতির কিছু কিছু উপাদান বাংলায় রক্ষিত আছে। এসব শব্দকে দেশী শব্দ নামে অবহিত করা হয়। অনেক শব্দের মূল নির্ধারণ করা যায় না, কিন্তু কোন ভাষা থেকে এসেছে তার হদিস মেলে। যেমন: কুড়ি (বিশ)-কোল ভাষা, পেট (উদর)-তামিল ভাষা, চুলা (উনুন)-মুন্ডারী ভাষা।"

ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, "বাংলা ভাষায় এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলোর মূলনির্ণয় করতে পারেন নি ভাষাতাত্ত্বিকেরা। তবে মনে করা হয়েছে যে, উদ্ভবের আগে যে-সব ভাষা ছিল আমাদের দেশে, সে-সব ভাষা থেকেই এসেছে ঐ শব্দগুলো। এমন শব্দকে বলা হয় 'দেশী শব্দ'। এগুলোকে কেউ কেউ বিদেশী বা ভিন্ন ভাষার শব্দের মতই বিচার করেন। কিন্তু এগুলোকে গ্রহন করা উচিত বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ হিসেবেই। ডাব, ডিঙ্গা, ঢোল, ডাঙ্গা, ঝোল, ঢেউ এমন শব্দ। এগুলোকে কী করে বিদেশী বলি।"

এদেশে আর্যরা আগমনের পূর্বে কোল, মুন্ডা, সাঁওতাল ইত্যাদি অর্নায জাতির বসবাস ছিল। আর্যদের প্রভাবে তারা প্রভাবান্বিত হলেও কিছু শব্দ তারা আর্যদের উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে। বাংলা ভাষায় শতকরা দুইটি শব্দ এ উৎস থেকে গৃহীত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। দেশী শব্দের মধ্যে কিছু অর্নায শব্দ এবং কিছু অজ্ঞাত শব্দও রয়েছে যার মূল জানা এখনও পর্যন্ত সম্ভব হয়েনি। বাংলার পূর্ববর্তী প্রাকৃত ভাষায় এগুলো প্রবেশ করে এবং পরে পরিবর্তিত হয়ে বাংলায় এসেছে।কতিপয় দেশী শব্দ: ঢেঁকি, ঢোল, কাঁটা, খোঁপা, ডিঙি, কুলা, টোপর, খোকা, খুকি, বাখারি, কড়ি, ঝিঙা, কয়লা, কাকা, খবর, খাতা, কামড়, কলা, গয়লা, চঙ্গ, চাউল, ছাই, ঝাল, ঝোল, ঠাটা, ডাগর, ডাহা, ঢিল, পয়লা, চুলা,আড্ডা, ঝানু, ঝোঁপ, ডাঁসা, ডাব, ডাঙর, খোঁড়া, চোঙা, ছাল, ঢিল, ঝিঙা, মাঠ, মুড়ি, কালা, বউ, চাটাই, খোঁজ, চিংড়ি, কাতলা, ঝিনুক, মেকি, নেড়া, কুলা, ঝাটা, মই, বাদুর, বক, কুকুর, তেঁতুল, গাঁদা, শিকড়, খেয়া, লাঠি, ডাল, কলাকে, ঝাপসা, কচি, ছুটি, ঘুম, দর, গোড়া, ইতি, যাঁতা, চোঙা, খড়, পেট, কুড়ি, দোয়েল, খবর, খোঁচা, গলা, গোড়া, গঞ্জ, ধুতি, নেকা, বোবা, একটা ইত্যাদি।

দেশি শব্দ মনে রাখার কৌশল: এক গঞ্জের কুড়ি ডাগড় টোপর মাথায় দিয়ে চোঙ্গা হাতে পেটের জ্বালায় চুলা কুলা ডাব ও ডিংগা নিয়ে টং এর মাচায় উঠল।

৫.বিদেশী শব্দঃ যেসব শব্দ সংস্কৃত ছাড়া বিভিন্ন বিদেশী ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় এসেছে সেগুলোকে বিদেশী শব্দ বলা হয়।

এদেশের সাথে বিদেশী ভাষাভাষীদের বিভিন্ন যোগাযোগের মাধ্যমে প্রচুর বিদেশী শব্দ বাংলা ভাষার শব্দ সম্ভারের সাখে যুক্ত হয়ে এর শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়াছে। মুসলমান শাসকেরা বহুদিন যাবত এদেশে শাসন করেছেন। তাঁরা ছিলেন বহিরাগত। তাঁদের ধর্মীয় ভাষা ছিল আরবি, রাজভাষা ছিল ফারসি এবং ঘরোয়া ভাষা ছিল তুর্কি। তাঁদের প্রভাবে এ তিন জাতের বহু শব্দ বাংলা ভাষার শব্দের সাথে যোগ হয়েছে। ড.সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, প্রায় আড়াই হাজারের মত ফারসি শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে।

এর পরে এসেছে পর্তুগিজ ও ইংরেজরা। বহুদিনব্যাপি তারা এদেশ শাসন করেছে। ফলে প্রচুর পর্তুগিজ ও ইংরেজি শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছে। তাছাড়া ইংরেজি শব্দের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার কিছু কিছু শব্দও বাংলা ভাষায় স্থান পেয়েছে। নিচে বিদেশী শব্দের কিছু উদাহরণ দেওয়া হলোঃ

১. আরবি শব্দঃ অন্দর, অছিলা, অজুহাত, আতর, আজব, আখের, আদত, আক্কেল, আকবর, আবির, আমল, আমলা, আদাব-কয়দা, আমিন, আমানত, আয়েশ, আরক, আরশ, আসবাব, আলবত, আলাদা, আসামী, আসল, আলখাল্লা, আলোয়ান, ইজারা, ইজ্জত, ইনাব, ইনকিলাব, ইশারা, ইশতিঞার, ইসলাম, ইহুদি, ইন্তিকাল, এলাকা, এজমালি, এজলাস, এক্তিয়ার, ওমরা, ওকালত, ওজন, ওয়াসিল, ওয়ারিশ, ওয়াস্তে, কসুর, কসাই, কলাই, কলপ, কাফন, কাফের, কামাল, কামিজ, কায়দা, কালিয়া, কায়েম, কাহিল, কিস্তি, কুলুপ, কুদরত, কুমকুম, কেতাব, কেত, কেরামতি, কেল্লাফতে, ক্রোক, খতম, খবর, খয়রাত, খতিয়ান, খাদিম, খাতির, খসড়া, খাজনা, খারাপ, খারিজ, খালি, খাসা, খেতাব, খেয়াল, খেসারত, খেলাপ, খোলা, গজল, গলদ, গড়গড়া, গোসা, গায়ের, গর, গরিব, গলদ, ছবি, ছাদ,জনাব, জহর, জবাব, জমা, জমান, জামায়েত, জলদি, জলসা, জরিপ, জরিমানা, জল্লাদ, জাহাজ, জালিয়াত, জাহির, জিনিস, জিজিরা, জেরা, জেরাফ, জুলুম, জ্বালাতন, জৌলুস, তওবা, তকদির, তদবির, তকলিফ, তছরুফ, তহবিল, তলব, তফসিল, তবিয়ত, তফাৎ, তমশুক, তামাদি, তরফ, তর্জমা, তখত, তাগিদ, তাজিয়া, তালাক, তাজ্জব, তানপুরা, তারিফ, তামাম, তালু, তালিকা, তামিল, তুফান, তুলকামাল, তৈয়ার, তোড়া, তোয়াক্কা, দখল, দজ্জাল, দফা, দলিল, দফারফা, দাখিল. দাওয়াই, দায়রা, দালাল, দেনা, দোয়া, দুনিয়া, দোয়াল, দৌলত, নকসা, নকল, নবাব, নজির, নহবত, নাকাত, নাগাল, নেহাত, নিশা, নূর, নিকাশ, নিবা, নায়ের, নাজির, ফকির, ফক্কর, ফতে, ফতুর, ফতোয়া, ফরাস, ফসল, ফসকা, ফর্দ, ফায়দা, ফানুস, ফালার, ফাঁক, ফি, ফুরসত, ফেরার, ফোয়ার, ফৌজ, বহি, বই, বকেয়া, বন্দুক, বদর, বয়ান, বহর, বদল, বাতিল, বিলকুল, বাদে, বাবদ, বেসাতি, বিলাত, মকতব, বোরাক, মজবুত, মক্কেল, মজুদ, মঞ্জুর, মঞ্জিল, মদদ, মনি, মফস্বল, মলম, মর্জি, ময়দান, মশাল, মাশলা, মশগুল, মসজিদ, মসনদ, মহড়া, মহকুম, মস্করা, মহল্লা, মহব্বত, মহাফেজ, মাতব্বর, মাদ্রাসা, মাফ, মাফিক, মামলা, মারফত, মামুলি, মাল, মালিক, মাল্লা, মাসহারা, মিনার, মিছরি, মিসর, মুনশী, মুনাফা, মুনসেফ, মুরব্বী, মুলতবী, মুলুক, মুসলিম, মুসাফির, মুসাবিদা, মুশকিল, মুহুরি, মেজাজ, মেরামত, মোকদ্দমা, মেহনত, মোসাহেব, মোক্ষম, মৌলবী, মোতায়েন, মোকাবিলা, মোক্তার, মোলায়েম, মোল্লা, মৌসুমি, রদ, রপ্ত, রফা, রাশি, রায়ত, রিপু, রুজু, রেওয়াজ,রোয়াক, লহমা, লাখেরাজ, লায়েক, লেপ, লেফাফা, লেবু, লোকসান, শরবত, শখ, শয়তান, শরাব, শারিক, শহীদ, শুরু, শর্ত, সই, সড়কি, সদর, সন, সফর, সনদ, সবুর, সহিস, সাকিন, সাফ, সাবেক, সামাল, সিকি, সিন্দুক, সুলতান, হক, হজম, হদ্দ, হরফ, হরকত, হাওলাত, হাজত, হাকিম, হামলা, হারাম, হাল, হালত, হাসিল, হালুয়া, হিকমত-হিম্মত, হিসাব-নিকাশ, হুকুম, হুজ্জত, হুলিয়া, হেফাজত ইত্যাদি।

২. ফারসি শব্দঃ মূলত আরবি, তুর্কি ও ফারসি শব্দ বাংলা ভাষায় ফারসি শব্দ হিসেবে পরিচিত। যেমন:

ফারসি ও আরবি মিশ্রণঃ আজগুবি, আবহাওয়া, খামখেয়াল, কুচকাওয়াজ, খুনখানাপ, খোশমেজাজ, খোদাতালা, জবরদখল, গরম মশ্লা, দস্তখত, দহরম-মহরম, নাবালক, নাদাবি, নাহক, নারাজ, নেক, নজর, নিমকহারাম, বেয়াকুব, বে-কসুর, বাজিমাত, বেহদ্দ, বেফাঁস ইত্যাদি।

ফারসি ভাষা থেকে আগত গুরুত্বপূর্ণ কিছু শব্দ

আন্দাজ, আওয়াজ, আফসোস, আবহাওয়া, অজুহাত, আবাদ, আমদানি, আমেজ, আয়না, আরাম, আসমান, আস্তানা, আশকারা, ইয়ার, ওস্তাদ, কামাই, কারখানা, কারবার, কারিগর, কিনারা, কিশমিশ, কুস্তি, কোমর, খরচ, খঞ্জর, খরগোশ, খুব, কম, বেশি, জোড়, তোপ, চশমা, মোকদ্দমা, মালিক, সিপাহী, খোদা, দরিয়া, খাতা, গোলাপ, রোজ, গোয়েন্দা, চাকরি, চাঁদা, চাকর, চালাক, চেহারা, জবাব, দরজা, তীর (বাণ), তৈয়ার, দারোয়ান, বস্তা, বাজি, মজুর, ময়দা, মোরগ, মাহিনা, মিহি, মেথর, রপ্তানি, রাস্তা, রুমাল, রেশম, লাশ, শহর, শায়েস্তা, শিরনামা, সওদা, সবজি, সবুজ, সরকার, সর্দি, সাজা, সাদা, সানাই, সে (তিন), হপ্তা, হাজার, হিন্দু, হাঙ্গামা, কার্তুজ, কাফে, কুপন, রেস্তোরা, ওলন্দাজ, দিনেমার, ইংরেজ ইত্যাদি।

ফরাসী(ফ্রান্স) শব্দ মনে রাখার কৌশল:

গেরেজে কার্তুজের ডিপোতে বুর্জোয়া ইংরেজ ও ওলন্দাজদের রেস্তোরার কুপন আছে।

চশমার দোকানদার ও কারখানার মেথর রোজার দিনে নামায না পড়ায় বেগম বাদশার কাছে নালিশ করলেন। তাই শুনে বাদশা তাদেরকে দরবারে ডেকে দস্তখত নিয়ে জানোয়ার ও বদমাশ বলে দোজখে পাঠালেন।

আরবি-তুর্কি মিশ্রণঃ খাজাঞ্চি।

৩. তুর্কি শব্দঃ ড.সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, বাংলায় তুর্কি শব্দ চল্লিশটির বেশী হবে না। আলখাল্লা, কুলি, কোর্মা, খাতুম, বেগম, লাশ, বাবা, বাবু, চাকু, বোচকা, দারোগা, ফিরিঙ্গি, ফালতো ইত্যাদি।

তুর্কি শব্দ শব্দ মনে রাখার কৌশল:

বিবি বেগম কোর্মা খায় - বাবা বাহাদুর দেশ চালায়।

দারোগা বাবু তাকিয়ে দেখে - গালিচায় কুলির লাশ।

চাকু হাতে বাবুর্চি তাই দেখে হতবাক।

৪. ইংরেজী শব্দঃ অফিস, আর্ট, আস্তাবল, এনামেল, এজেন্ট, ইঞ্জিন, কংগ্রেস, কনস্টেবল, কফি, কমা, ক্যাপ্টন, কার্নিশ, কলেজ, কেক, কেটলি, কেয়ার, কোরেসিন, কেস, কোর্ট, কোট, কোম্পানি, ক্যামাবিস, কামেরা, ক্রীশ্চান, ক্লাব, ক্লার্ক, গার্জেন, গেজেন্ট, গেঞ্জি, গেট, গেলাস, চেক, চেয়ার, চেন, জেটি, জেল, জ্যাকেট, টাইপ, টিকিট, টিফিন, টিন, টেবিল, টেলিগ্রাম, ট্যাক্সি, ট্রাম, ট্রেন, ডক, ডজন, ডাক্তার, ডিপো, ড্রাম, ড্রেন, থিয়েটার, নম্বর, নিব, পকেট, প্যাকেট, পাউডার, পাস, পার্শ্বেল, পালিশ, পিয়ন, পুলিশ, পেট্রোল, পেন, পেনসিল, পেনসন, ফোন, ফটো, ক্রক, বাক্স, ফ্যাশন, ফ্লাট, বোনাস, মাস্টার, মাইল, মিটার, মেস, ম্যানেজার, সার্কাস, সার্জন, সিগ্যানাল, সেমিকোলন, সিনেমা, সেমিজ, হল, শার্ট, স্টেশন, হাইকোর্ট ইত্যাদি।

৫. পর্তুগিজ শব্দঃ ক্রুশ, পাদ্রি, গির্জা, আনারস, পেঁপে, পেয়ারা, কামরাঙা, কপি, বাতাবি, তামাক, আতা, চাবি, তোয়ালে, বোতল, বালতি, গামলা, গুদাম, বারান্দা, ফিতা, পেরেক, কামরা, টুপি, আলকাতরা, কামিজ, বোতাম, মিস্ত্রি, আচার, বাসন, পাচার, আয়া, আলপিন, কেদারা, কোরানি, গরাদ, জানালা, পারদ, পাউরুটি, পিস্তল, বেহালা, বোমা, মার্কা, মাস্তুল, সাবান, গুদাম, সাগু ইত্যাদি।

পর্তুগীজ শব্দ মনে রাখার কৌশল

গীর্জার পাদ্রী চাবি দিয়ে গুদামের আলমারি খুলে তাতে আনারস পেঁপে পেয়ারা আলপিন ও আলকাতরা রাখলেন। কেরানি দিয়ে কামরা পরিষ্কার করে জানালা খুলে দিলেন। তারপর পেরেক ইস্ত্রি ইস্পাত ও পিস্তল বের করে বালতিতে রেখে বোমা বানালেন।

রত্নাবতী বিষাদসিন্ধুর পানে তাকিয়ে থাকা উদাসীন পথিকের মনের কথা বুঝতে পেরে বাঁধা খাতাটি গাজি মিয়ার বস্তানীতে রাখলেন।

৬. ওলন্দাজ শব্দঃ ইস্কাপন, রুইতন, হরতন, টেক্কা, তুরুপ, চিরাতন, ইস্কুল ইত্যাদি।

ওলন্দাজ শব্দ মনে রাখার কৌশল: ওলন্দাজরা ইস্কাপন, টেক্কা, তুরুপ, রুইতন, হরতন দিয়ে তাস খেলে।

৭. হিন্দি শব্দঃ জঙ্গল, কুত্তা, আচ্ছা, সঙ্গ, ঠান্ডা, ভরসা, বাচ্চা, চানাচুর, চেহারা, খিল, ঝুট, চিজ, পানি, কমলা, খানাপিনা, চরকা, চাহিদা, কাহিনী, চামেলি, তাহড়া, আন্দাজ, সাথী ইত্যাদি।

৮. চীনা শব্দঃ চা, চিনি, লিচু, এলাচি, সিঁদুর, টাইফুন, হোয়াংহো, সার্টিন, গুলাচি (ফুল) ইত্যাদি।

৯. গুজরাটি শব্দঃ হরতাল, জয়ন্ত্রী, খদ্দর ইত্যাদি।

১০. ইতালি শব্দঃ গেজেট, ম্যালেরিয়া, ম্যাজেন্টা, রোম ইত্যাদি।

১১. ইন্দোনেশীয় শব্দঃ বর্তমান, বাতাবি ইত্যাদি।

১২. বর্মী শব্দঃ ফুল, ফুঙ্গি, লুঙ্গি, লামা, নাষ্পি, আরাকান ইত্যাদি।

১৩. মারাঠি শব্দঃ যৌথ, বর্গী ইত্যাদি।

১৪. রুশ শব্দঃ সোভিয়েত, বলশেভিক, কমিউন, স্পুৎনিক ইত্যাদি।

১৫. জাপানি শব্দঃ রিকশা, সাম্পান, প্যাগোডা, হারিকিরি, হা¯œাহেনা, নিষ্পন ইত্যাদি।

১৬. মালয়: কাকাতুয়া, গুদা, কিরিচ, সাগু।

১৭. জার্মানি : ফ্যুরার

১৮. পেরু : কু ইনাইন

১৯. অস্ট্রেলিয়া : ক্যাঙ্গারু

২০. ইতালি: ম্যাজেন্টা;

২১. রুশ : বলশেভিক;

২২. সিংহল : বেরিবেরি।

২৩. গ্রিক : কেন্দ্র, দাম, সুরঙ্গ।

২৪. সাঁওতালি : বোঙ্গা, হাঁড়িয়া।

২৫. তামিল : চেট্টি।

২৬. পাঞ্জাবি: তরকা।

২৭. তিববতি: লামা;

২৮. মারাঠি : বরগি।

২৯. দক্ষিণ আফ্রিকা: জেব্রা;

■ অর্থানুসারে শব্দের শ্রেণীবিভাগ

অর্থগতভাবে বাংলা ভাষার শব্দ সমূহকে তিনভাগে ভগা করা হয়েছে। যেমন:

১. যৌগিক শব্দ, ২. রূঢ় বা রুঢ়ি শব্দ ও ৩. যোগরূঢ় শব্দ

১. যৌগিক শব্দঃ যেসব শব্দ প্রকৃতি ও প্রত্যয়যোগে গঠিত হয় এবং প্রকৃতি ও প্রত্যয় বিশ্লেষণ করলে যেসব শব্দের ব্যবহারিক অর্থের সাথে অভিন্ন অর্থ পাওয়া যায়, সেগুলোকে যৌগিক শব্দ বলে। যেমন: কৃ + তব্য = কর্তব্য (যা করা উচিত); গৈ + অক = গায়ক (গান করে যে)। এখানে কর্তব্য ও গায়ক শব্দে ব্যবহারিক অর্থও যথাক্রমে একই রয়ে গেছে।

২. রূঢ় বা রুঢ়ি শব্দঃ যেসব প্রত্যয় নিষ্পন্ন শব্দ উহার প্রকৃতি ও প্রত্যয়গত অর্থ প্রকাশ না করে জন সমাজে প্রচলিত পৃথক অর্থ বুঝায়, অর্থাৎ অন্য কোন বিশিষ্ট অর্থ জ্ঞাপন করে, সেসব শব্দকে রূঢ় শব্দ বা রুঢ়ি শব্দ বলে। যেমন হস্তী (হস্ত + ইন) অর্থাৎ হস্ত বা হাত আছে যার। কিন্তু প্রচলিত অর্থে হস্তী বলতে বিশেষ পশু শ্রেণীকে নির্দেশ করে। অনুরূভাবে:

রূঢ় ব্যুপত্তিগত অর্থ ব্যবহারিক অর্থ
দুহিতা যে দোহন করে কন্যা
রাখাল যে রক্ষা করে যে গবাদিপশু চরায়
অতিথি যার স্থিতি নেই মেহমান
হরিণ যে হরণ করে পশুবিশেষ
পাঞ্জাবী পাঞ্জাব দেশের অধিবাসী জামা বিশেষ
গবাক্ষ গরুর চোখ জানালা
কৃশল যে কুশ আহরণ করে নিপণ
বাঁশি বাঁশের তৈরি বাদ্যযন্ত্র বিশেষ
স্বতন্ত্র যার নিজের তন্ত্র আছে দলভুক্ত নয়
অর্ধাঙ্গিনী অর্থ অঙ্গের অধিকারী স্ত্রী
শ্রুশ্রুষা শোনার ইচ্ছা রোগীর সেবা করা
প্রবীণ প্রকৃষ্টরূপে বীণা বাজাতে পারেন যিনি বয়স্ক ব্যক্তি
গো যে গমন করে গরু
সন্দেশ সংবাদ মিষ্টান্ন

৩. যোগরূঢ় শব্দঃ সমাস নিষ্পন্ন যেসব শব্দ পূর্ণভাবে সমাস্যমান পদসমূহের অর্থের অনুগামী না হয়ে কোন নির্দিষ্ট অর্থপ্রকাশ করে, তাদেরকে যোগরূঢ় শব্দ বলে। যেমন-পঙ্কে জন্মে যা = পঙ্কজ। পঙ্কে বা পুকুরে অনেক কিছু জন্মালেও পঙ্কজ বলতে শুধুমাত্র পদ্মফুলকে বুঝায়। অনুরূপভাবে:

যোগরূঢ় ব্যুপত্তিগত অর্থ ব্যবহারিক অর্থ
সারোজ সরোবরে জন্মে যে পদ্ম
জলদ জল দেয় যা মেঘ
অন্ন খাদ্য দ্রব্য ভাত
অসুখ সুখের অভাব অসুস্থতা
বলদ যে বল দান করে গুরু
বৈবাহিক বিবাহের দ্বারা সম্বন্ধযুক্ত পুত্র বা কন্যার শ্বশুর
সুহৃদ সুখের হৃদয় যার বন্ধু
মহাযাত্রা মহাসমারোহে যাত্রা মৃত্যু
জলধি জল ধারণ করে যে সমুদ্র

 

■ গঠন অনুসারে শব্দের শ্রেণীবিভাগ

শব্দ গঠনের দিক থেকে বিচার করলে বাংলা ভাষার সকল শব্দকেই প্রধানত দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। যেমন: ১. মৌলিক শব্দ ও ২. সাধিত শব্দ বা যৌগিক শব্দ।

১.মৌলিক শব্দঃ বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত যেসব শব্দকে বিশ্লেষণ করা বা ভাঙ্গা যায় না, সেগুলোকে মৌলিক শব্দ বলে। তাই মৌলিক শব্দ হচ্ছে ভাষার অবিভাজ্য স্পষ্ট অর্থযুক্ত শব্দ। যেমন- মা, বাবা, বই, খাতা, বল, কলম, ভাই, বোন, হাত, পা, মুখ, কান ইত্যাদি। এসব শব্দকে ভাঙলে বা বিশ্লেষণ করলেও কোন অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। এসব শব্দ পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে বলে এদেরকে স্বয়ংসিদ্ধ শব্দও বলা হয়।

মৌলিক শব্দগুলোকে ভাঙা যায় না বলে এগুলোকে প্রকৃতিও বলা হয়। প্রকৃতি দুই প্রকার। যেমন: ক, নাম প্রকৃতি ও খ. ক্রিয়া প্রকৃতি।

ক. নাম প্রকৃতিঃ যেসব শব্দ দ্বারা বস্তু, জাতি, প্রাণী, জাতি, স্থান, গুণ বা দোষের নাম বুঝায়, তাকে নাম প্রকৃতি বলে। যেমন: বই, পাথর, লাল, কাল, ঢাকা ইত্যাদি।

খ. ক্রিয়া প্রকৃতিঃ ক্রিয়ার মূলকে বলা হয় ক্রিয়া প্রকৃতি বা ধাতু। যেমন: র্ক, র্ধ, র্ম ইত্যাদি।

২. সাধিত শব্দ বা যৌগিক শব্দঃ বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত যে সব শব্দকে বিশ্লেষণ করা বা ভাঙ্গা যায় এবং শব্দের ভগ্ন অংশ থেকেও তার পুরোপুরি অর্থ বোধগম্য হয়, সেই বিভাজ্য শব্দকে সাধিত শব্দ বলা হয়। যেমন: মেঘ + লা = মেঘলা, হাত + পাখা = হাতপাখা, বাবু + গিরি = বাবুগিরি, দ্বি + ধা = দ্বিধা, হাত + ল = হাতল ইত্যাদি।

সাধিত শব্দকে গঠন প্রকৃতির দিক থেকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। যেমন: ক. কৃদন্ত শব্দ, খ. তদ্ধিতান্ত শব্দ ও গ. সমাসবদ্ধ শব্দ।

ক. কুদন্ত শব্দঃ ধাতুর সাথে কৃৎপ্রত্যয় যোগে যে শব্দ গঠিত হয়, তাকে কৃদন্ত শব্দ বলে। যেমন: √লড় + আই = লড়াই, √ঘুম + অন্ত = ঘুমন্ত, √রাখ + আল = রাখাল ইত্যাদি।

খ. তদ্ধিতান্ত শব্দঃ মৌলিক শব্দের সাথে তদ্ধিত প্রত্যয় যোগে যেশব্দ গঠিত হয়, তাকে তদ্ধিতান্ত শব্দ বলে। যেমন: রূপা + আলি = রূপালি, ঢাকা + আই = ঢাকাই, ছাপা + আনা = ছাপাখানা, দুষ্ট + আমি = দুষ্টামি ইত্যাদি।

গ. সমাসবদ্ধ শব্দঃ সমাসের নিয়মে একাধিক শব্দ সহযোগে যেসব শব্দ গঠিত হয়, তাকে সমাসবদ্ধ শব্দ বলে। যেমন: নদী মাতা যার = নদীমাতৃক, সিংহ চিহ্নিত যে আসন = সিংহাসন, চাঁদের ন্যায় মুখ = চাঁদমুখ ইত্যাদি।

এছাড়াও আরও নানা পদ্ধতিতে শব্দ গঠিত হতে পারে। যেমন:

১. উপসর্গযোগেঃ উপসর্গের নিজস্ব বা আলাদা কোন অর্থ নেই। মূল শব্দের পূর্বে উপসর্গ প্র, পরা, পরি, সু ইত্যাদি বসে নতুন শব্দ গঠন করে। শব্দ আদিতে প্র:যোগেঃ প্রধান, প্রচার, প্রগতি, প্রসিদ্ধ ইত্যাদি। অ:যোগেঃ অদেখা, অচেনা, অবেলা ইত্যাদি।

২. বিভক্তিযোগেঃ ডাঙ্গায় বাঘ, জলে কুমির। এখানে ডাঙ্গা + য় = ডাঙ্গায় এবং জল + এ = জলে, যথাক্রমে 'য়' ও 'এ' বিভক্তি যুক্ত হয়েছে।

৩. সন্ধির সাহায্যেঃ পরি + ঈক্ষা = পরীক্ষা, যথা + ইষ্ট = যথেষ্ট, সম্ + লাপ = সংলাপ, অতি + আচার = অত্যাচার, বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়, নে + অন = নয়ন, গৈ + অক = গায়ক ইত্যাদি।

৪. পদের দ্বিরুক্তিতেঃ গ্রামে: গ্রামে, ভালোয়: ভালোয়, ভাইয়ে: ভাইয়ে ইত্যাদি।

৫. পদ পরিবর্তনের সাহায্যেঃ লোক:লৌকিক, মুখ:মৌখিক, জাতি:জাতীয়, ভদ্র:ভদ্রতা, বিবাহ:বিবাহিত, মেধা:মেধাবী ইত্যাদি।

৬. সমাস নিষ্পন্ন দ্বারাঃ পঙ্কে জন্মে যা ঃ পঙ্কজ, গায়ে হলুদ দেয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = গয়ে হলুদ, চার রাস্তার সমাহার = চৌরাস্তা ইত্যাদি।

৭. সংখ্যাবাচক শব্দযোগেঃ এগার, এগারই, একাদশ, একত্রিশ, একত্রিংশ, একত্রিশে ইত্যাদি।

■ বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত মিশ্র শব্দ

বাংলা ভাষায় নানা জাতের শব্দের সমাবেশে এর ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে। তৎসম, তদ্ভব, দেশী ও বিদেশী শব্দের মধ্যে পারস্পারিক মিল সাজশে তথা শব্দ বা প্রত্যয়যোগে যেসব নতুন শব্দ গঠিত হয়েছে সেগুলোকে ¤্রশি বা শংকর শব্দ বলা হয়। ¤্রশি শব্দগুলো প্রায় সমার্থক। এগুলো সমাসবদ্ধ পদের মত নতুন শব্দের ও অর্থের সৃষ্টি করে। কোন কোন সময় দেশী ও বিদেশী শব্দ মিলেও এরূপ শব্দ গঠিত হতে পারে। যেমন:

বিদেশী-দেশী শব্দযোগেঃ রাজাউজীর, হাটবাজার, ধনদৌলত, মাস্টারমশাই, পাইরুটি, ডাক্তারবাবু, ফুলহাতা, হেডপ-িত ইত্যাদি।

বিদেশী-বিদেশীঃ হেডমৌলবী, পুলিশসাহেব ইত্যাদি।

প্রত্যয়যোগে মিশ্র শব্দঃ ডেপুটিগিরি, প-িতি, মাস্টারি, গৃহিণীপনা ইত্যাদি।

বাংলা ভাষায় মোট সোয়া লক্ষের মত শব্দ রয়েছে। এর মধ্যে তৎসম শব্দের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজার, আরবি-ফারসি আড়াই হাজার, তুর্কি ও ইংরেজি শব্দ প্রায় আটশ এবং শ দেড়েক শব্দ রয়েছে পর্তুগীজ ও ফারসি। এছাড়া বিদেশী কিছু সংখ্যক শব্দও রয়েছে। অন্যান্য শব্দ তদ্ভব ও দেশী।