লেকচার-২৪: বাংলা ব্যাকরণ (অনুসর্গ)

Category: Bangla
Posted on: Wednesday, September 13, 2017

Share:

বাংলা ভাষায় এমন কতকগুলো অব্যয়বাচক শব্দ রয়েছে, যারা কখনও বাক্যমধ্যে বিশেষ বা সর্বনামের পরে, আবার কখনও শব্দ বিভক্তির ন্যায় বাক্যমধ্যে ব্যবহৃত হয়ে বাক্যের অর্থ প্রকাশে সাহায্য করে, তাদের অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয় বলে ।

মুনীর চৌধুরি ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরির মতে, "বাংলা ভাষায় যে অব্যয় শব্দগুলো কখনও স্বাধীন পদরূপে, আবার শব্দ বিভক্তির ন্যায় বাক্যে ব্যবহৃত হয়ে বাক্যের অর্থ প্রকাশে সাহায্য করে, সেগুলোকে অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয় বলে ।" অনুসর্গ কখনও প্রাতিপাদিকের পরে, আবার কখনও 'কে', 'র' ইত্যাদি বিভক্তি যুক্ত শব্দের পরে বসে । প্রাতিপদিক বা বিভক্তি যুক্ত শব্দের অনু বা পশ্চাতে বসে বলে তাদের অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয় বলে । যেমন-

তপু আবার ফিরে এসেছে আমাদের মাঝে । অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে ওরা । বছর খানেক পরে রেণুকে বিয়ে করে তপু । ক্যাপিটালে তার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল । ভোর হতে ছেলেবুড়ো এসে জামায়েত হল । বাংলা ভাষায় সাধু ও চলতি রীতিতে অনুসর্গ ব্যবহারের সময় কখনও কখনও ভিন্ন ভিন্ন রূপ হতে পারে । যেমন- সাধু রীতিঃ বলিয়া, থাকিয়া, হইতে, দিয়া, করিয়া, লাগিয়া ইত্যাদি । চলতি রীতিঃ বলে, থেকে, হতে, দিয়ে, কবে, লেগে ইত্যাদি ।

 অনুসর্গের প্রকারভেদ অনুসর্গ দু'প্রকার হতে পারে । যেমন- ১. বিভক্তিসূচক অনুসর্গ ও ২. অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয় ।

১. বিভক্তিসূচক অনুসর্গঃ হতে, থেকে, চেয়ে, সাথে, চাইতে, দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক, কারণে, জন্যে প্রভৃতি বিভক্তিসূচক অনুসর্গ । যেমন-

ক. আমা হতে এ কাজ হবে না সাধন । খ. নকলের চেয়ে আসল ভাল । গ. কি কারণে এখানে আসলে । ঘ. তোমার জন্যে আমার খুবই মায়া লাগে ।

২.অনুসর্গ অব্যয় বা কর্মপ্রবচনীয়ঃ বিনা, অপেক্ষা, সাথে, যেন প্রভৃতি যেসব অব্যয় বা অব্যয় স্থানীয় পদ উপমা, তুলনা ও কারকাদি বুঝাতে ব্যবহৃত হয়, তাদের অনুসর্গ অব্যয় বা কর্মপ্রবচনীয় বলে । যেমন-

ক. তার মত এমন নিষ্ঠুর লোক আর নেই । খ. পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি । গ. জল বিনা মাছ বাঁচে না । ঘ. সার্কাস দেখা বাবদ আমার পঞ্চাশ টাকা খরচ ।

 অনুসর্গের বাক্যে প্রয়োগ

 

অপেক্ষা: হেলেনা অপেক্ষা রেহেনা সুন্দরী । চাইতে : আমার চাইতে সে বেশী লম্বা । চেয়ে : 'এর চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুঈন ।' থেকে : এইমাত্র আমি সেখান থেকে ফিরলাম । কারণে : 'পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলই দায় ।' জন্য : বিপদে কারও জন্য কেউ কাঁদে না । হেতু : 'কি হেতু আগমন তবে?' ছাড়া : মনোযোগ ছাড়া পাঠ-প্রস্তুত হয় না । বৈ : সত্য বৈ মিথ্যা বলব না । বিনা : 'দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে?' উপর : 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই ।' নিচে : সত্যকে বির্সজন দিয়ে তুমি এতটা নিচে নেমে যাবে তা ভাবতেও পারিনি । মাঝে: 'সবার পিছে, সবার নিচে, সব হারাদের মাঝে ।' কাছে : 'তব কাছে এই মোর শেষ নিবেদন ।' পাশে : 'বিপদের সময় যে পাশে থাকে সে-ই প্রকৃত বন্ধু ।' সঙ্গে : 'সৎ-সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ-সঙ্গেসর্বনাশ ।' মত : বেকুপের মত কাজ করে বসলাম । নামে : হাসান নামে আমার এক বন্ধু ছিল । তরে : 'কিসের তরে অশ্রু ঝরে?' অবধি : ছেলেটি জন্ম অবধি বোবা । পরে : 'সুখের পরে দুঃখ আসে, দুঃখের পরে সুখ ।' পানে : 'চেয়ে থাকি নিতুই তার পথ পানে ।' ভেতরে : মনের ভেতরে দুষ্টুমি রাখতে নেই । সহকারে: আগ্রহ সহকারে শিক্ষদের কথা শুনতে হয় । পক্ষে : সবার পক্ষেমিথ্যা বলা সম্ভব নয় । প্রতি : জনপ্রতি একশত টাকা চাঁদা ধরা হয়েছে । সহিত : তেলের সহিত পানি মিশে না । সহ : শিকারী বন্দুকসহ ফিরে এল । বলে : যাকে বন্ধু বলে ভাব, সে তোমার চির শত্রু । বিনি : বিনি সুতায় গাঁথা মালা । বিহনে : 'উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ ।' বশত : বিশেষ কারণ বশত আজ তিনি আসতে পারেননি ।

 অনুসর্গ ও উপসর্গের পার্থক্য

অনুসর্গ ও উপসর্গের পার্থক্য সমূহ নিম্নরূপঃ

 

অনুসর্গ উপসর্গ
১. অনুসর্গ স্বাধীন পদ হিসেবে বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে । ১. উপসর্গ স্বাধীন পদ হিসেবে বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে না ।
২. অনুসর্গ কখনো কখনো বাক্যের মধ্যে বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে বসে, আবার কখনো বা শব্দ বিভক্তির ন্যায় বাক্যর মধ্যে ব্যবহৃত হয়ে বাক্যের অর্থ প্রকাশে সাহায্য করে । ২. উপসর্গ অন্য শব্দের পূর্বে বসে শব্দের অর্থের সম্প্রসারণ, পরিবর্তন, পূর্ণতা, সংকোচন, এমন কি নতুন অর্থবোধক শব্দ তৈরি করতে পারে ।
৩. অনুসর্গ বিভক্তির মত ব্যবহৃত হয় । ৩. উপসর্গ বিভক্তির মত ব্যবহার হয় না ।
৪. অনুসর্গের নিজস্ব অর্থ আছে । ৪. উপসর্গের নিজস্ব অর্থ নেই ।
৫. অনুসর্গসমূহ হলো- নিকট, দিয়ে, দ্বারা, থেকে, কর্তৃক, হতে ইত্যাদি । ৫. উপসর্গসমূহ হলো- প্র, পরা, অপ, অনা, নি, অব ইত্যাদি ।