বাব হোপ

Category: General
Posted on: Tuesday, September 19, 2017

Share:

যে লোক মানুষকে হাসাবার জন্যে আশি হাজার মাইল পথ ভ্রমণ করেছেন তাঁর নাম ‘বাব হোপ’ । তিনি জীবনে শুধু একটি মাত্র বিষয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতেন- সেটা হচ্চে একটি পরিপূর্ণ হাসি।

আশি হাজার মাইল পথ। শুধু মানুষকে হাসাবার জন্যে এ দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণ । – দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি সেনাবাহিনীর লোকদেরকে হাসাবার জন্য এবং তাদের নিরানন্দ মনে অনন্দ সঞ্চার করার জন্যে এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করেন।

এই ভ্রমণ কালে বিপদের ঝুঁকিহ কম ছিল না। যেমন, কেবার আল-জেরিয়ায় তাঁর কোম্পানীর ওপর প্রচন্ড বোমা বর্ষিত হয়েছিল। একবার ইতালিতে তিনি এক বিমান ঘাটি ও গোলাবারুদের গুদামের মধ্যখানে আটকা পড়েছিলেন। আর এ সময় শত্রুর বিমান থেকে অবিরাম গোলা বর্ষিত হচ্ছিল। কিন্তু এসব তাঁর পরওয়া ছিল না মোটেও। তাঁর মনে মাত্র একটি চিন্তাই ঘুরপাক খেতে থাকতো কি করে তিনি কৌতুক অভিনয় দ্বারা লোকের মনে হাসি আনন্দের উদ্রেক করবেন। তাই তিনি এ বিপদজনক পরিস্থিতির মধ্যেও নিঃশংকচিত্তে কখনো ট্রাকে, কখনো জীপে আবার কখনো ট্যাঙ্কে চড়ে হাসিরবোমা ফাটাতে চলে যেতেনে যেখানে সেখানে- সেনা ছাউনেীতে তাঁর ডাক পড়ত আনন্দ পরিবেশেনের প্রয়োজনে।

একবার তিনি তাঁর কৌতুক অভিনয় চলাকালে জানতে পারলেন যে, ছয়শ’ সৈন্যের একটি দল দশ মাইল পথ ভেঙ্গে তাঁর অভিনয় দেখতে আসছিল। পথে শক্র সৈন্য কর্তৃক বাধা প্রাপ্ত হয়ে ফিরে গেছে। অভিনয়-শেষে লোকের হাত তালির গুঞ্জণ থামতেই তিনি দলবল নিয়ে জীপে চড়ে বসলেন এবং সেই আগমন প্রয়াসে ব্যর্থ সিপাহীদের সন্ধানে বের হলেন। নিজের পিদ জেনেও তিনি সেই সেনা দলটিকে খুঁজে বের করলেন সেই রাতেই বৃষ্টি সত্বেও আবার কৌতুক অভিনয়ের ব্যবস্থা করলেন।

কোন অভিনেতার পক্ষেই তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি প্রথমে কৌতুক অভিনয় করে বেড়াতেন। তারপর যুদ্ধের সময় কৌতুক অভিনয়কে যুদ্ধের প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্যে রণাঙ্গনে নিয়ে ছাড়েন। শুধু বিভিন্ন রণাঙ্গন গুলোতেই কৌতুক রহস্য পরিবেশন করে ক্ষান্ত হতেন না, তিনি বরং প্রশিক্ষণরত কোম্পানী গুলো হাস্যরস পরিবেশন করে পুলক আবহাওয়া সৃষ্টি করতেন।

আলেস্কোতে সৈন্য চলাচল ও পরিবহনের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন লেফটেনেন্ট জেনারেল সাইমন। একদিন সাইমন এক অদ্ভুত বার্তা পেলেন- তাতে লেখা ছিল- “আমরা নেচে গেয়ে পুলক-অভিনয় করে আনন্দ পরিবেশন করে থাকি। আপনার এলাকায় শো দেখাতে অনুমতি দেবেন ?” নীচে ছিল বাব হোপের স্বাক্ষর।

হাঁ সূচক জবাব পেয়ে তিনি সদলবলে আলেস্কো পৌছলেন। একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের নিকট অভিনয় প্রদর্শনের ইচ্ছা, কিন্তু সেখানে তাঁকে মঞ্চ স্থাপনে এত ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল যে, রাজ প্রাসাদে প্রবেশ করতেও এত ঝামেলা পোহাতে হয় না।

আমেরিকার সব কৌতুকক অভিনেতার মধ্যে তিনিই ছিলেন শীর্ষ স্থানীয়। জন্মগত ভাবে তিনি ইংরেজ। সাত বৎসর বয়সের সময়ই তিনি থিয়েটারে অভিনয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। একবার এক হস্‌ণীয় গির্জাপ্রাঙ্গনে এক মেলঅ বসেছিল। তখন বার হোপের বয়স দশ কি বার। তার ইচ্ছা হলো দর্শকদের সামনে একটি কবিতা আবৃত্তি করবেন। কিন্তু আবৃত্তি করতে দাঁড়িয়ে কবিতার আগের লাইন পরে পরের লাইন আগে করে ফেললেন। তদুপরি উচ্চারণেও ছিল অসংখ্য ভুল। লোকেরা জোরে জোরে বিদ্রুপবানে তাকে জর্জরিত করে ফেললো । অন্য বালক হলে সেদিন লজ্জা ও সংকোচে পালিয়ে নিস্তার লাভ করতো কিন্তু তাঁর পালান দূরে থাক তাঁর যেন উৎসাহ আরো বেড়ে গেল। তিনি স্মীতমুখে দর্শকদেরকে ঝুঁকে ঝুঁকে সালাম করতে লাগলেন। ব্যাপার দেখে মনে হচ্ছিল যেন লোকেরা তাঁকে নিরুৎসাহিত বদলে উৎসাহিত করছিল।

বার বৎসর বয়সের সময় তিনি একটি মোটর কারখানায় কাজ করতেন তখনো তাঁর ঘাড়ে কৌতুক অভিনয়ের ভূত সাওয়ার ছিল। ঘটনাক্রমে ম্যানেজার কক্ষে একটি রেকর্ডার দেখতে পান তিনি।দেখেই ওটা ব্যবহারের লোভ সামলাতে পারলেননা; তার ডিউটি পড়তো রাত্রে। পরদিন রাত্রে কারখানায় এসেই সমবয়স্কদের নিয়ে টেপ রেকর্ডের সামনে গেলেন এবং আজ রাতে শহরে গরম গরম অভিনয় হবে’ নামক একটি গান সকলে মিলে গেয়ে রেকর্ড করলেন। রেকর্ড করার পর সেলেন্ডারটি মেশিন চাপিয়ে এই গানটি শুনতে লাগলেন। একদিন সেলেগুার নামাবার কথা কারুর মনে ছিল না। সকালে ম্যানেজার কক্ষে প্রবেশ করেই এই গানের তীব্র নিনাদে আপ্যায়িত হলেন। তাঁর বুঝতে বাকী রইল না এ কার কান্ড। পর দিনই বার হোপের চাকরী নট হয়ে গেল।

অবশেষে তাঁর অনুভূতি জন্মালো যে, থিয়েটারে কৌতুক অভিনয় করার জন্যেই তিনি। একটি থিয়েটার পার্টিতে নৃত্যগীতের অভিনয়ে যোগদান করলেন তিনি। একজন সহকর্মীও তাঁর সঙ্গে থাকতো। পরবর্তী কয়েক বৎসর পর্যন্ত তিনি এ কাজে লেগে থাকেন। জিনিসপত্র দুষপ্রাপ্য হওয়ায় অতিকষ্টে তাঁকে জীবন ধারণ করতে হতো। তাঁকে এত নিম্নমানের খাবার খেতে হতো যে, সে কথা মনে হলে আজও তাঁর পেটে ব্যথা অনুভূত হয়।

নৃত্যগীত পরিবেশন করার এ একঘেয়েমী জীবন ভাল লাগছিল না। তাঁর পরিবর্তন কামনা করছিলেন তিনি। সে পরিবর্তনও এলো এক অভাবিত উপায়ে। একদিন রাতে মালিক তাঁকে ডেকে বললেন, দর্শকদের জানিয়ে দাও, আগামী সপ্তাহে তাঁরা এক নতুন তামাশা অবলোকন করতে পারবে। বাবা হোপ দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, প্রিয় দর্শনবৃন্দ । কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমি আনন্দের সহিত ঘোষণা করছি যে, আগামী সপ্তাহ থেকে আপনারা এক অভিনয় ও অদ্ভুত খেলা দর্শন করার সুযোগ লাভ করবেন। তাঁর বাক্য পূর্ণ হবার আগেই দর্শকগন করতালি ও আনন্দধ্বনি শুরু করেছিল। দশ মিনিট পর্যন্ত কোলাহল চলতে লাগল। ঘোষনা শেষে ফিরে এলে মালিক তাঁকে ডেকে বললেন, বাব হোপ তুমি নৃত্যগীতে অযথা প্রতিভার অপচয় করেছো। কৌতুক অভিনয় তোমার উপযুক্ত ক্ষেত্র। এ অভিনয়েই তোমার সাফল্যের পথ উন্মুক্ত হবে। কথাটা বাব হোপেরও মনে ধরল। তখন থেকে তিনি কৌতুক অভিনয়ে আত্ননিয়োগ করেন। সে থেকে আজ অবধি তিনি এই অভিনয়ই করে চলছেন। তাঁর কোন অভিনয় দেখে কোন দর্শন নিরাশ হয়েছে এমন কথা আজ পর্যন্ত কেউ বলেনি।

বর্তমানে তিনি বৎসর আশি হাজার পাউন্ড উপার্জন করে থাকেন। হলিউডের অভিনেতারা মনে করেন তিনি টাকা কামাবার ও তা ধরে রাখার মন্ত্র জানেন। একবার হোপ যে ব্যাঙ্কে বেশি টাকা জমা রাখতেন সে ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে যেয়ে এক লোক ধরলো ।এ লোক ব্যবসায়ে টাকা খাটাবার ব্যাপারে পরামর্শ দাতা বলে পরিচিতি ছিল। তার হোপের ব্যবসায়ে পরামর্শ দাতা হিসেবে কাজ করা ইচ্ছা । এ ব্যাপারে তার তদবির বাব হোপের নিকট করার জন্যে ম্যানেজারকে সে অনুরোধ করলো । ম্যানেজার জবাব দিলেন, আমি বিগত তিন বৎসরা থেকে বাব হোপকে জানি, তার পরামর্শ দাতা না হয়ে আপনি বরং তাকেই আপনার পরামর্শ দাতা রুপে গ্রহণ করুন। তাতে আপনার অবস্থার যে উন্নতি হবে তা আমি হলপ করে বলতে পারি।

জীবনে তিনি একটি মাত্র চান্স মিস করেছেন। ১৯৩০ সালের ঘটনা। রেডিওতে তার কাজ করা প্রস্তাব হলো। এই বলে তিনি সে প্রস্তাব নাকচ করলেন, সময়ের অপচয় করতে আমি প্রস্তুত নই। রেডিও বেশি দিন চলবে না। মাত্র পাঁচ বৎসরেই রেডিও খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করলো। বাব হোপেরও রেডিও শ্রোতা জগতে নাম করার নেশায় পেয়ে বসলো। ভাগ্যক্রমে তিনি পুনর্বার রেডিওতে চান্স পেলেন। রেডিও শ্রোতাদের মধ্যে খ্যাতি অর্জনের জন্যে তিনি এমন উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলেন যে, সারারাত জেগে তিনি তার কৌতুক টেকনিকগুলোতে শান দিতে লাগলেন। কিন্ত রেডিও অফিসের নীরব ষ্টুডিওতে ঢুকেই তিনি একবারে দমে গেলেন। তিনি বলেন থিয়েটারে দর্শকের চেয়ারে লোক না দেখলে আমার যেমন উৎসাহ উবে যেতো খেলা দেখাবার সাহস হারিয়ে ফেলতাম, রেডিও অফিসের খালী ষ্টুডিওতে ঢুকেও আমার সেই দশা হয়েছিল। তাই আমি জনশূন্য ষ্টুডিওতে খেলা প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।

বাব হোপের ষ্টুডিও সংলগ্ন আর একটি ষ্টুডিওতে এডগার বরগন তার খেলা দেখাচ্ছিল। ষ্টুডিওটি ছিল লোকে লোকারণ্য। তিনি রেডিও অফিসের এক ভৃত্যকে কিছু পয়সা দিয়ে তার ও এডগার বর্গেনের স্টুডিওর মধ্যকার দরজাটা খোলা রাখার ব্যবস্থা করে রাখলেন বার্গেনের খেলা শেষ হতেই লোক করতালি দিতে দিতে হুড় হুড় করে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তখন বাব হোপ দরজায় দাড়িয়ে লোকদের ইশারা করে বলতে লাগলেন, এদিকে এদিকে। লোকেরা তার ষ্টুডিওতে এসে ভিড় করে বসলো। নির্ধারিত সময়ে এই জনসমষ্টিরা সামনে রেডিওর শ্রোতাদের জন্যে তাঁর কৌতুক অভিনয় শুরু করলেন। তাঁর কৌতুক অভিনয়ে হাসতে হাসতে লোকের পেটের চামড়ায় খিল ধরার উপক্রম হয়েছিল।

যে কোন অবস্থায় অভিনয় সুলভ চটুলতা তার চোখে মুখে বিদ্যামান থাকতো। কর্ম ছাড়া বসে থাকা তার কাছে খুবই খারাপ লাগতো। তিনি বেজায় কর্মচঞ্চল ছিলেন। একই সময়ে এত কাজ করতেন যে, লোক তাঁকে ষ্ফুর্তির জীবন্ত মূর্তি বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। টেলিফোনে কথা বলার সময়েও তিনি এক ঠায় দাড়াতেন না হাটতে হাটতে কথা বলতেন। তিনি কখনো এক বসায় কোন পুস্তক পাঠ শেষ করেননি। কিন্তু ছোট ছোট কৌতুক কাহিনী ও নাট্যগ্রন্থ খুব মনোযোগ সহকারে পাঠ করতেন।

তাঁর যেসব কৌতুক রহস্যে লোকেরা হেসে লুটোপুটি খেতো সেগুলো ছিল তাঁর উর্ধ্ব মস্তিস্কের চিন্তার ফসল। দুনিয়ার তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদই হচ্ছে হাস্য কৌতুক রসাত্মক কাহিনীতে ভরপুর সে ফাইলগুলো যা তিনি শয়ন কক্ষের লাগোয়া কক্ষে অত্যন্ত সুবিন্যস্ত আকারে সাজিয়ে রেখেছেন। তাঁকে ছাড়া এই ঘরটি খোলার আর কারুর অধিকার নেই। এতদ ব্যতীত ছয় হাজার কৌতুক সাহিত্যিক সর্বদা তাঁর জন্যে হাস্য কৌতুক রসাত্মক কাহিনী, নাটক লেখায় নিয়োজিত ছিলেন।

অন্যান্য শিল্পীদের ন্যায় বাব হোপকেও কতকটা রক্ষণশীল মনোবৃত্তির অধিকারী বলে মনে হয়। প্যারামাউন্ট ষ্টুডিওর কর্তৃপক্ষ তার সঙ্কীর্ণ ড্রেসিং রুমটার বদলে একটি আধুনিক ডিজাইনের নতুন ড্রেসিং রুম বানিয়ে দেবার প্রস্তাব করলে তিনি তার পুরাতন ড্রেসিং রুমটি ত্যাগ করতে অস্বীকার জ্ঞাপন করেন । এই রুমটিতেই তিনি তাঁর প্রথম ফিল্মের সাজ পোষাক বদল করেছিলেন। কিন্তু তিনি এখনো তার সেই পুরাতন ড্রেসিং রুমটি ত্যাগ করেননি। রুমটি এত সঙ্কীর্ণ যে অতি কষ্টে দু’জন লোক বসতে পারে।

তিনি আশা করেন, হলিউডের সর্বোচ্চ পদক অস্কার লাভ করার সম্মান তিনি অর্জন করবেন। তিনি সে সম্মান অর্জন করুন আর না করুন কিন্তু মহাযুদ্ধের সময় তিনি লক্ষ লক্ষ সিপাহীর মনে সর্বোচ্চ স্থান দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আজো তিনি দুনিয়া জোড়া সিনেমা দর্শকদেরকে হাস্য রসের অনাবিল আনন্দে মাতিয়ে রেখেছেন। তিনি প্রায়ই বলেন, মাত্র একটি বিষয় ছাড়া আমি ঠান্ডা মাথায় কিছু ভাবতে পারি না সেটা হচ্ছে কি উপায়ে লোকের মুখে হাসির বান সৃষ্টি করা যায়।