Share:

এক গণক তার মাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এখন তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্টগণকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বিগত শতাব্দীর শেষের ঘটনা। একদিন নিউইয়র্ক সিটি কলেজ গ্রাউন্ডে কয়েকজন যুবক ব্যাস বল খেলছিল। হঠাৎ কি কারণে তাদের মধ্যে মারামারি বেধে যায। একটি যুবক আর একটি যুবকের মাথার ওপর সজোরে বলটি নিক্ষেপ করে। আঘাত প্রাপ্ত যুবকটি সঙ্গে সঙ্গে সজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। পরে মেডিক্যাল পরীক্ষায় দেখা গেল তার কানের পর্দা ফেটে গেছে।

এই দুর্ঘটনার তার জীবনের মোড় সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেল। তার পরিকল্পনা ছিল ওয়েষ্ট পয়েন্ট মিলিটারী একাডেমীতে ভর্তি হওয়া ও সামরিক অফিসারের পদ লাভ করা । কানের পর্দা ফাটার দরুন সামরিক একাডেমী কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করতে সম্মত হলেন না। সুতরাং বাধ্য হয়ে তাকে তার পরিকল্পনা পাল্টাতে হল। তিনি ব্যবসায়ে নেমে পড়েন। কারবারে তার প্রভূত উন্নতি হয় ফলে যথেষ্ট পয়সা উপার্জন করতে সক্ষম হন তিনি ।‌ ব্যবসায়ী মহলে অচিরেই তিনি একন ঝানু ব্যবসায়ী হিসাবে মর্যাদার আসন লাভ করেন।

প্রেসিডেন্ট উইলসন তার ব্যবসাসিক বুদ্ধিতে এত মুগ্ধ হন যে, তাকে ব্যবসা- বানিজ্য সম্পর্কিত এমন এক গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল করেন, ইতিপূর্বে আমেরিকার ইতিহাসে আর কোন নাগরিক এরূপ পদে বহাল হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করতে পারেনি। প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে আমেরিকার সমগ্র শিল্প বাণিজ্যের দায়িত্ব ছিল তার হাতে। কোন শিল্পকারখানা চালু রাখা বা বন্ধ করে দেওয়ার সর্বময় কর্তৃত্ব ছিল তার হাতে। তার বিনা অনুমতিতে কোন শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীই কোন কারখানার জন্য এক পাউন্ড লোহ, তামা, পিতল বা অন্য কোন ধাতু আমদানী করতে পারতেন না।

১৯১৯ সনে যখন প্রেসিডেন্ট ইউলসন শান্তি চুক্তিতে দস্তখত করার জন্য ইউরোপ গমন করেন, তার অর্থনৈতিক পরামর্শ দাতা হিসাবে তিনি বার্জকেও সঙ্গে নেন। যুদ্ধোত্তর সময়ে আমেরিকার একটি জটিল ও কঠিন সমস্যাকে তিনি অত্যন্ত বিচক্ষনতার সহিত সমাধান করেন- সমস্যাটি ছিল আমেরিকানবাসীকে কোন প্রকার বেকারত্বের ও আর্থিক ক্ষতির শিকারে পরিণত না করে যুদ্ধকালীন শিল্প থেকে সরিয়ে শান্তিকালীন শিল্পের দিকে ফিরিয়ে আনা।

ব্যাস বলের এক আঘাতেই শুধু বার্জের জীবনের গতি পথ বদলায়নি, একজন গণকের ভবিষ্যদ্বাণী তার জীবনের পালাবাদলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একবার তার মা তাকে এমন একজন গণকের কাছে নিয়ে যান যিনি দাবী করতেন যে, লোকের মাথার চুল ধরে তিনি বলে দিতে পারেন, ভবিষ্যৎ জীবনে তার কি কাজ করা বাঞ্ছনীয়। বার্নাড বার্জের মাথার শিরা ধরে তিনি বলে দেন যে, তার পক্ষে ব্যবসায়ী হওয়াই সমীচিন। কিন্তু পিতার ন্যায় চিকিৎসা বিশারদ হওয়াই ছিল তার জীবনের লক্ষ্য। এজন্য তিনি অন্তর থেকে প্রেরণা লাভ করতেন খুব। এক বৎসর পর্যন্ত চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়নও করেন কিন্তু মা প্রায়ই তাকে বলতেন, তোমার গণকের কথা মত ব্যবসায়ে বাণিজ্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা আবশ্যক, মাকে খুশি করা জন্যে তিনি এক শিশি বোতল প্রস্তুতকারী কারখানায় সপ্তাহে পনের শিলিং পারিশ্রমিকে চাকুরী নেন। এদিক রাতের বেলায় আইন শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে লাগলেন। এতে মার মনে আশংকা জন্মালো যে, শেষে না তিনি আবার উকিল হয়ে বসেন। গণকের পরামর্শ স্মরণ করে প্রায়ই পুত্রকে বলতে লাগলেন, বার্জ এমন কাজে হাত দাও বাবা যাতে বেশ দুটো পয়সা হাতে আসে। অবশেষে তিনি মায়ের কথাই শিরোধার্য করে নিলেন।

যে সময় তিনি ওয়াল ষ্ট্রিটে প্রবেশ করেন (আমেরিকার ধনী বনিক পাড়া) তখন শতকরা ৯৯ ভাগ কোটিপতিই ব্যবসায়ে মার খেয়ে ফতুর হয়ে যাচ্ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি পক্ষ লক্ষ পাউন্ড উপার্জন করেছিলেন। সত্যিই এ এক রেকর্ড বৈ কি। ওয়াল ষ্ট্রিটে বার্ণাডের এই বিষ্ময়কর সাফল্যের চাবিকাঠি কি ? এ সম্পর্কে দুটি বিষয়ই বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমতঃ তিনি বড় বড় ব্যবসায়ীগণের বন্ধুত্ব অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত তিনি সততা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, সদা হাস্যমুখ ও কর্মতৎপরতা দ্বারা ব্যবসায়ীগণের এমন আস্থাভাজন হয়ে পড়েছিলেন যে, তারা তাকে নিজেদের ব্যবসায়ের গোমর বলতেও কার্পণ্য করতেন না। এমনকি সঙ্গে করে তাকে খাওয়াতেন পর্যন্ত। ফলে তিনি দ্রুত উন্নতি করতে লাগলেন। বয়স তখন সাতাশও পুরেনি তিনি লীগড এন্ড মিটার তামার কেনার জন্য টমাস ফরচোন এর কাছ থেকে ২৬০০০ পাউন্ড লাভ করলেন।

ওয়াল স্ট্রিটে বার্জের উন্নতির আর একটি অন্যতম প্রধান কারণ এই ছিল যে, তিনি সব ব্যাপারে প্রকৃত তথ্য অবগত হওয়ার জন্যে সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। তিনি প্রতিটি কাজ সুপরিকল্পিত উপায়ে করতেন, কোন ব্যাপারে হাত দেওয়ার পূর্বে তিনি সে বিষয়ে আগাম তথ্য সংগ্রহ করতেন। পরিপূর্ণ পর্যালোচনা ব্যতীত তিনি কখনো কোন কাজে হাত দিতেন না।

কোন ব্যবসা সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ভবিষ্যদ্বাণী করার ব্যাপারে ব্যবসায়ী মহলে তার খুব সুনাম ছিল। এই যোগ্যতার জন্যই তিনি আমেরিকার পাঁচজন প্রেসিডেন্টের বাণিজ্য উপদেষ্টা হিসাবে সুনামের সহিত কাজ করার গৌরব অর্জন করেন। প্রেসিডেন্ট উইলসন তো তাঁকে রহস্য উদঘাটনের ডক্টর বলেই আখ্যা দিয়েছিলেন।

তিনি টাকা উপার্জন করতে যেমন ভালবাসতেন, টাকা তেমনি সৎপথে ব্যয় করতেও ভালবাসতেন। কয়েক বৎসর পূর্বে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে তিনি গোলাবারুদ প্রস্তুতকারী মেশিন ক্রয় করার নিমিত্তে আমেরিকার প্রতিরক্ষা দফতরকে ছ' লক্ষ পাউন্ড দান করুন। যুদ্ধের সময় অস্ত্রশস্ত্র আমেরিকার প্রয়োজন হতে পারে সে সম্পর্কে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য তিনি একটি উপদেষ্টা দলকে সতের হাজার পাউন্ড নিজের পকেট থেকে প্রদান করেন। এ টাকাটা সরকারেরই দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তিনি কিছুতেই সরকারকে এ টাকা দিতে দেননি। ১৯১৮ খৃষ্টাব্দে ওয়াশিংটনে ব্যাপক আকারে ফ্রুরোগ বিস্তার লাভ করলে গরীব জনসাধারণকে এ রোগের হাতত থেকে রক্ষার জন্রে তিনি একটি হাসপাতাল বানিয়ে দেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হলে যখন যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ শিল্পে নিয়োজিত হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে তিনি তাদেরকে স্ব স্ব বাড়ীতে যাবার পথ খরচা বাবদ দশ হাজার পাউন্ড দান করেন।

শৈশবকালে এক লজ্জাজনক ব্যাপার থেকে তিনি লজ্জা ও হীনমন্যতার শিকারে পরিণত হন। কয়েক বৎসর পর্যন্ত এই ব্যাধি তাকে মারাত্মক ভাবে পেয়ে বসেছিল। ঘটনাটা তার কাছে এমন নির্মম মনে হয়েছিল যে, আজ অবধি তিনি তা ভুলতে পারেন নি। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে বিদ্রুপ বা নিরুৎসাহিত করা কত মারাত্মক ক্ষতিকর ব্যাপার। ঘটনাটা ছিল এই, এক অনুষ্ঠানে কয়েকজন বালক কবিতা আবৃত্তি করছিল। বার্জও সে অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ছিলেন। তিনি আবৃত্তি করতে দাড়িয়ে গানের সুরে আবৃত্তি করতে লাগলেন। সামনের সারির এক শ্রোতা তার আবৃত্তির অনুকরণে আবৃত্তি করতে করতে তাকে বিদ্রুপ করছিল, এতে তিনি অত্যন্ত লজ্জা ও অপমান বোধ করলেন, তার উৎসাহ দমে গেল। তিনি চোখের অশ্রু ফেলে সেই অনুষ্ঠান থেকে পালিয়ে এলেন।

এই ঘটনার পর থেকে তাকে লজ্জা ও হীনমন্যতা বোধ এমন ভাবে পেয়ে বসল লজ্জা তাকে এমনভাবে পেয়ে বসলো যে, তিনি সিড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠতে পারলেন না নীচের একটি ঘরে লোক চক্ষুর আড়ালে বসে রইলেন। ঘটনাক্রমে এক ভদ্রলোক তাকে দেখে ফেললেন। তিনি তাকে উৎসাহ দিয়ে ওপরে নিয়ে গেলেন, তারপর একটি মেয়ের সহিত তার পরিচয় করিয়ে দিলেন ? এবার বার্জের লজ্জা যেন কমতে লাগলো। তিনি মেয়েটির সহিত নৃত্যে যোগ দিলেন। নৃত্যের সঙ্গে সঙ্গে তার সব লজ্জাশরওম উধাও হয়ে গেল।

বার্জ তার পিতার কাছ থেকে একটি উপদেশ ওয়ারেশী সুত্রে লাভ করেছিলেন। এ উপদেশই তার জীবনে পথের দিশা রুপে কাজ করেছে। পিতা তাকে একটি ফটোর নিচে এ উপদেশটি লিখে ফটোটা তাকে উপহার দিয়েছিলেন। ফটোটা বার্ণাড বার্জেরা ঘরের এমন এক স্থানে টাঙ্গানো ছিল যা আসতে যেতে চোখে পড়তো। উপদেশটা ছিল এই, অটুট অবিচলতা ও একাগ্রতাকেই জীবনের পথ প্রদর্শক হিসাবে গ্রহণ করবে।