বাংলাদেশের ইতিহাস

Category: Bangladesh
Posted on: Tuesday, September 19, 2017

Share:

প্রাচীন কাল
১.খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগেকার ঋগ্বেদের ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে বঙ্গ নামে দেশের প্রথম উল্লেখ আছে। এছাড়া মহাভারত, রামায়ণ গ্রন্থেও বঙ্গ জনপদ উল্লেখ আছে।
২. রাঢ় , সুক্ষ্ম, পুন্ড্রু, বঙ্গ প্রভূতি শব্দের সাহায্যে প্রাচীন কালে বিশেষ জাতি বা উপজাতি বোঝানো হত। রাঢ় বলতে মধ্য পশ্চিম বঙ্গ, সুক্ষ বলতে দক্ষিণ পশ্চিম বঙ্গ, পুন্ড্রু বলতে উত্তর বঙ্গ, বঙ্গ (ফরিদপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, বাখরগঞ্জ ও পটুয়াখারী) বলতে পূর্ব বঙ্গ, সমতট-হরিকেল বলতে পূর্ববঙ্গেও দক্ষিণাঞ্চল প্রভূতি বিশেষ বিশেষ স্থান বুঝায়। এখনো রাঢ় বলতে মধ্য পশ্চিম বঙ্গ এবং বরেন্দ্র বলতে উত্তর বঙ্গকে (রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর) বুঝানো হয়। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের জনপদ হরিকেল নামে পরিচিত ছিল।
৩. প্রাচীন রাঢ়ের রাজধানীর নাম কি ছিল – কোটীবর্ষ
৪. প্রাচীন জনপদগুলোর মধ্যে গৌড় (রাজশাহীর পশ্চিমাংশ) ছিল সর্বাধিক সুপরিচিত। প্রাচীন গৌড় নগরীর অংশ বিশেষ বাংলাদেশের চাপাই নবাবগঞ্জ জেলায় অবস্থিত।
৫. বাংলাদেশের প্রাচীনতম জনপদ হল পুন্ড্রুবর্ধন (বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চল)।প্রাচীন পুন্ড্রুবর্ধন জনপদটির বর্তমান নাম মহাস্থানগড়। এখানে মৌর্যযুগের শিলালিপি পাওয়া গেছে।মহাস্থানগড় এক সময় বাংলার রাজধানী ছিল তখন এর নাম ছিল পুন্ড্রুবর্ধন।বিখ্যাত সাধক শাহ সুলতান বলখির মাজার মহাস্থানগড়ে অবস্থিত।
৬. বঙ্গ শব্দের উৎপত্তি যে অঞ্চলে ‘বং’ গোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করত তারাই-এ নামে পরিচিত। বঙ্গ সংস্কৃত শব্দ। বং গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের বসবাস ছিল ভাগীরথী নদীর পূর্বতীর থেকে আসামের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত।
৭. বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা ও নোয়াখানী অংশ কে সমতট বলা হত। এর কেন্দ্রস্থল ছিল কামতায়।পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গ ছিল সমতট।
৮. বাংলার পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে প্রাচীন ও নব্য প্রস্তরযুগের এবং তাম্রযুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে বলে ঐতিহাসিককেরা মনে করেন এ সকল যুগে বাংলার পাবর্ত্য সীমান্ত অঞ্চলেই মানুষ বসবাস করত এবং ক্রমে তারা অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে।

বাঙ্গালী জাতির সৃষ্টি (আর্যপূর্ব জাতি থেকে আর্যকরণ)
১. আর্যদের আগমনের পূর্বে এদেশে অনার্যদের বসবাস ছিল। আর্যপূর্ব জনগোষ্ঠী মূলত নেগ্রিটো, অষ্টিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনীয় এই চার শাখায় বিভক্ত ছিল।
২. নিগ্রোদের মতো দেহ গঠনযুক্ত এক আদিম জাতি এদেশে বসবাস করত যারা নেগ্রিটো নামে পরিচিত।
৩. প্রায় ৫-৬ হাজার বছর পূর্বে অষ্ট্রিক জাতি (অস্ট্রো-এশিয়াটিক) বা নিষাদ জাতি ইন্দোচীন থেকে আসাম হয়ে বাংলায় প্রবেশ করে নেগ্রিটোদের উৎখাত করে। এরাই কোল, ভীম, সাঁওতাল, মুন্ডা, শবর, পুলিন্দ, মাল পাহাড়ী, নিষাদ প্রভূতি উপজাতির পূর্বপুরুষ হিসাবে চিহ্নিত (আদি অস্ট্রেলিয় বা ভেড্ডিড)। বাঙ্গালী রক্তে এদের প্রভাব রয়েছে।
৪. অষ্ট্রিক জাতির সমকালে বা কিছু পরে প্রায় ৫ হাজার বছর পূর্বে দ্রাবিড় জাতি এদেশে আসে এবং সভ্যতা উন্নত বলে অষ্ট্রিক জাতিকে গ্রাস করে। অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় জাতির সংমিশ্রনেই সৃষ্টি হয়েছে আর্যপূর্ব বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী। এদের রক্তধারা বর্তমান বাঙালি জাতির মধ্যে প্রবাহমান।
৫. বাংলাদেশে আর্যীকরণের পরেই মঙ্গোলীয় বা ভোটচীনীয় গোষ্ঠীর আগমন ঘটে বলে বাঙালির রক্তের সঙ্গে এদের মিশ্রণ উল্লেখযোগ্য নয়। বাংলার উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে এদের অস্তিত্ব রয়েছে। গারো, কোচ, ত্রিপুরা, রাজবংশী, নাগা, মেচ, কিরাত, মিঞ্জার, কুকী, আরাকানী, চাকমা ইত্যাদি উপজাতি এই গোষ্ঠীভুক্ত।
৬. অস্ট্রিক-দ্রাবিড় জাতির মিশ্রণে যে জাতির প্রবাহ চলছিল তার সঙ্গে আর্যজাতি এসে সংযুক্ত হয়ে গড়ে তুলেছে বাঙালি জাতি।
৭. মৌর্য বিজয় থেকে গুপ্তবংশের অধীকার পর্যন্ত (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টীয় ৫০০ অব্দ) সময়ে মোট আটশ বছর ধরে বাংলাদেশে ক্রমে ক্রমে আর্যীকরণের পালা চলে। তবে গুপ্তযুগেই আর্য ভাষা ও সংস্কৃতির দৃঢ়মূল হয়।
৮. খ্রিস্টীয় অস্টম শতাব্দীর দিকে সোমীয় গোত্রের আরবিয়রা ইসলাম ধর্ম প্রচার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বাঙালি জাতির সঙ্গে সংমিশ্রিত হয়। তাদের অনুসরণে নেগ্রিটো রক্তবাহী হাবশিরাও এদেশে আসে। এভাবে অন্তত দেড় হাজার বছরের অনুশীলন গ্রহণ বর্জন ও রূপান্তরীকরণের মাধ্যমে বাঙালির জন জীবন গড়ে উঠে।

আর্য জাতি: বৈদিক সভ্যতা
১. আর্যদের আদি বাসস্থান ইউরাল পর্বতের দক্ষিণে তৃণভূমি অঞ্চল। হাঙ্গেরী, অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া নিয়ে আর্যদের আদি বাসস্থান। আবার কারো কারো মতে দক্ষিণ রাশিয়া ছিল আর্যদের আদি বাসস্থান।
২. ভারতীয় উপমহাদেশে সিন্ধু সভ্যতার পরের সভ্যতা হল আর্য সভ্যতা। আর্যরা খ্রীস্টপূর্ব ১৪০০ বা ১৫০০ অব্দে ভারতে আসে। আর্যরা সেমিটিক জাতির লোক।
৩. আর্যদের পূর্বে বাংলার ধর্মমত সম্পর্কে সঠিক বিবরণ মিলে না।
৪. আর্যরা এদেশে বৈদিক ধর্মের প্রচলন করে।
৫. আর্য সাহিত্যকে বৈদিক সাহিত্য বলা হয়। তাদের প্রাচীনতম সাহিত্য হল বেদ। বেদ সংস্কৃত ভাষায় রচিত। বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে ঋগবেদ-ই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন।
৬. সর্ব প্রথম বঙ্গ দেশের নাম পাওয়া যায় – ঋগ্বেদের ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে

ভারতে পারসিক ও ম্যাসিডোনীয় অভিযান:
৭. পারস্য সম্রাট কাইরাসের সময় হতেই পারসিকদের ভারত আক্রমণ শুরু হয় (খ্রীস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে)।
৮. খ্রীস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে আলেকজান্ডার হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে ভারত আক্রমণ করেন। এ সময় তক্ষশীলার রাজা ছিলেন অম্ভি।অম্ভি দূত মারফত আলেকজান্ডারের কাছে আনুগত্য স্বীকার ও উপটোকন পাঠান।
৯. খ্রীস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে পুরুর সহিত আলেকজান্ডারের হিদাস্পিসের যুদ্ধ (ঝিলাম নদীর তীরে) হয়।যুদ্ধে পুরু পরাজিত হয়। কিন্তু তার বীরোচিত উত্তর ও শৌর্যে মুগ্ধ হয়ে আলেকজান্ডার তাকে তার রাজ্য ও আরো কয়েকটি বিজিত রাজ্য উপহার দেন। এইভাবে তারা বন্ধুতে পরিণত হন।
১০. পুরু রাজ্য জয়ের পর আলেকজান্ডার মগধ রাজ্য জয়ের জন্য অগ্রসর হন। কিন্তু তার সৈন্যরা ক্লান্তির কারণে আর অগ্রসর হতে চাইলেন না।জনৈক গ্রীক দার্শনিকের মতে মগধ রাজ্যের অসীম শক্তির কথা শুনে সৈন্যরা ভীত হন। ফলে আলেকজান্ডার স্বদেশের দিকে রওয়ানা দেন এবং পথে খ্রীস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে ৩৩ বছর বয়সে ব্যবিলনে প্রাণত্যাগ করেন।

মৌর্য সাম্রাজ্য (৩২৪-১৮৫ খ্রীস্টপূর্ব)
১. মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত (৩২৪-৩০০খ্রীস্টপূর্ব)। তিনি গ্রীকদের বিতাড়িত করেন। ইহাই ভারতবর্ষে প্রথম ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য।
২. মৌর্যযুগের ইতিহাস পাওয়া যায় গ্রীকদূত মেগান্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’ এবং চন্দ্রগুপ্তের পরামর্শদাতা ও সাহায্যকারী কৌটিল্য (অপর নাম চাণক্য বা বিষ্ণুগুপ্ত) রচিত ‘অর্থশাস্ত্র’ থেকে।এছাড়া অশোকের শিলালিপি থেকে।
৩. বৌদ্ধ লেখকদের মতে উত্তর ভারতের পিপ্পলীবন নামক স্থানে ‘মৌর্য’ নামক এক ক্ষত্রিয়কূলে চন্দ্রগুপ্তের জন্ম। এজন্য তার বংশ ‘মৌর্য’ নামে পরিচিত।
৪. তক্ষশীলার অধিবাসী কৌটিল্য চন্দ্রগুপ্তকে ক্রয় করে তাকে শিক্ষিত করেন। কৌটিল্য ছিলেন ব্রাহ্মণ।
৫. আলেকজান্ডারকে ভারত বর্ষে আহ্বান জানান তৎকালীন রাজা অম্ভী। আলেকজান্ডারের শিক্ষক এরিস্টটল।
৬. চন্দ্রগুপ্ত আলেকজান্ডারের সহিত সাক্ষাত করে নন্দরাজের বিরুদ্ধে অভিযানের অনুরোধ জানান। ঐ সময় তিনি সাধারণ লোক ছিলেন।
৭. চন্দ্রগুপ্ত সৈন্যবাহিনী গড়ে নন্দরাজ ধনন্দকে তিনবারের প্রচেষ্টায় পরাজিত করেন এবং মগধের সিংহাসন দখল করেন।
৮. আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর চন্দ্রগুপ্ত ভারত হতে গ্রীকদের বিতাড়িত করেন এবং মগধ থেকে আফগানিস্থান পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। তার সহিত বন্ধুত্ব স্থাপনের জন্য আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলিউকস স্বীয় কন্যা হেলেনকে বিয়ে দেন তার কাছে। এবং তার রাজসভায় মেগান্থিনিস নামক এক দূত প্রেরণ করেন।
৯. বংশক্রম চন্দ্রগুপ্ত (জৈন) (৩২৪-৩০০) এর ছেলে বিন্দুসার (ব্রাহ্মণ,৩০০-২৭৩) তার ছেলে অশোক (বৌদ্ধ, ২৭৩-২৩২) তার পুত্র কুনাল তার পুত্র দশরথ ও সমপ্রতি (বৃহদ্রথ)।
১০. উত্তরের হিমালয় হতে দক্ষিণ মহীশূর এবং পশ্চিমে আরব সাগর হতে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত অশোকের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। কলিঙ্গ (বর্তমান উড়িষ্যা ও মাদ্রাজের অংশ বিশেষ) যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং আর রাজ্য বিজয়ের ব্যাপারে অগ্রসর হননি। অশোকের রাজত্বকাল জানার শ্রেষ্ঠ উপাদান তার শিলালিপি। তিনি ত্রৈবার্ষিক ও পঞ্চবার্ষিকী পরিক্রমা নেন। অশোক শাসন ব্যবস্থা দেখাশুনার জন্য ধর্মমহামাত্র ও রাজুক নামে কর্মচারী নিযুক্ত করেন। অশোক রাজ কাজ সংক্রান্ত সমস্ত লেখা ব্রাহ্মীলিপিতে সংরক্ষণ করতেন।
১১. সম্রাট অশোকের মৃত্যুও পর বিভিন্ন রাজ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এছাড়া তার উত্তরশূরীরা অনুপযুক্ত থাকায় ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ হয়।
১২. মৌর্য বংশের শেষ সম্রাট ছিলেন বৃহদ্রথ। তিনি তার সেনাপতি কর্তৃক ১৮৭ খ্রীস্টপূর্বাব্দে নিহত হন।
১৩. মোর্য ও গুপ্ত বংশের রাজধানী কোথায় ছিল – গৌড়/মহাস্থানগড়
১৪. মৌর্যযুগে বাংলার শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক বিবরণ পাওয়া যায় না।
১৫. মৌর্যযুগে বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী ছিল পুন্ড্রুনগরে।
১৬. বরেন্দ্র জনপদ মৌর্যসাম্রাজ্যের ভিতরে ছিল।

কুষাণ সাম্রাজ্য
১৭. মৌর্য যুগের পর বিদেশী লোক দ্বারা কুষাণ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বংশের অধিকাংশই বৌদ্ধধর্মালম্বী। কুষাণ সম্রাটদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন কণিঙ্ক। কুষাণরা গান্ধার শিল্প প্রতিষ্ঠা করেন।

গুপ্ত সাম্রাজ্য
১. মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রায় পাঁচ শতাব্দী পর্যন্ত উত্তর ভারতে কোন রাজ শক্তি ছিল না। চতুর্থ শতাব্দীতে গুপ্ত বংশের উত্থান ঘটে।
২. প্রথম হিন্দু সাম্রাজ্য। গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত। তিনি মহারাজ উপাধি ব্যবহার করতেন। সম্বভত তিনি মগধ্যের (বঙ্গ দেশের) কোন একটি ক্ষুদ্রাংশের রাজা ছিলেন।
৩. শ্রীগুপ্তের পুত্র ঘটোৎকচ তার পুত্র প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০-৩৩৩ সাল)। তিনি মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেন। সাধারণত তাকে গুপ্ত সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।
৪. সমুদ্রগুপ্ত (৩৪০-৩৮০) প্রথম চন্দ্রগুপ্তের পুত্র। তিনি গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন। তার দ্বিগ্বিজয়ের জন্য ঐতিহাসিকগণ তাকে ভারতীয় নেপোলিয়ন নামে আখ্যায়িত করেন।
৫. দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৮০-৪১৫) সমুদ্রগুপ্তের পুত্র।
৬. তিনি বিক্রমাদিত্য উপাধি গ্রহণ করেন। তার রাজত্বকাল জানার জন্যে বহু লিপি ও মুদ্রা আছে। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে চীনদেশীয় পর্যটক ফা-হিয়েন ভারতে আসেন (৪০১-৪১০)। বীরসেন নামক প্রখ্যাত কবি তার মন্ত্রী ছিলেন। কবি কালিদাস তার সভাকবি ছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত নবরত্নের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
৭. দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের পুত্র প্রথম কুমারগুপ্ত মহেন্দ্রাদিত্য (৪১৫-৪৫৫সাল) তার পুত্র স্কন্দগুপ্ত বিক্রমাদিত্য (৪৫৫-৪৬৭সাল)।
৮. স্কন্দগুপ্ত ছিলেন গুপ্ত বংশের সর্বশেষ শক্তিশালী সম্রাট। তার আমলে মধ্য এশিয়া হতে ‘হুন’ নামক এক শক্তিশালী জাতি গুপ্ত সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন। অবশ্য তিনি তাদেরকে পরাজিত করেন। স্কন্দগুপ্তের মৃত্যুর পর তার পরবর্তী শাসকগণ যোগ্য না হওয়ায় আস্তে আস্তে গুপ্ত সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
৯. গুপ্ত যুগে এদেশে ব্রাহ্মণ্য ও তান্ত্রিক মতবাদের ব্যাপক প্রসার ঘটে। অষ্টম শতক থেকে বৈষ্ণব ধর্মের সম্প্রসারণ ঘটে। গুপ্ত যুগে শৈব ধর্মের প্রচলন ছিল।
১০. গুপ্তযুগে বাংলার শাসন পদ্ধতির সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিবরণ আছে। বাংলার কিছুটা অংশ গুপ্ত শাসকদের অধীনে ছিল। বাকীটা ছিল সামন্ত রাজাদের শাসনাধীন।
১১. গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের সময় মগধে গুপ্ত বংশ ছিল। এই গুপ্ত বংশের সহিত পূর্বের গুপ্ত বংশের মিল ছিল কিনা জানা যায়নি। যাহাই হোক পরবর্তী গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কৃষ্ণগুপ্ত (৫১০সাল)।

পরবর্তী গুপ্ত বংশ
১২. গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে পরবর্তী গুপ্ত বংশ নামে পরিচিত একটি নতুন রাজবংশের উত্থান হয়। গৌড় তখন এই রাজবংশী রাজাদের অধীন ছিল।

গৌড় বংশ
১. গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর যে সকল স্বাধীন রাজ্য গড়ে উঠে তার মধ্যে গৌড় রাজ্য ছিল অন্যতম। এই রাজ্যের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী রাজা ছিলেন শশাঙ্ক। ৬১৯ সালেও শশাঙ্ক ক্ষমতায় ছিলেন।তিনি হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক। শশাঙ্ক ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের নিগ্রহকারী।৬০৬ সালে আরোহণ।
২. প্রাচীন জনপদ গুলোকে সর্বপ্রথম একত্রিত করেন – রাজা শশাঙ্ক
৩. মোখরী ও পরবর্তী গুপ্ত রাজবংশের মধ্যে সংঘর্ষে উভয়ে দুর্বল হয়ে পড়লে ৭ম শতকের গোড়ার দিকে শশাঙ্ক গৌড় দখল করে নেন।পশ্চিমে মগধ এবং পূর্বে বঙ্গও তার অধিকারভুক্ত হয় বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন।
৪. প্রাচীন বাংলা কোন শাসক সর্বপ্রথম প্রাচীন জনপদগুলোকে একত্রিত করেন – রাজা শশাঙ্ক
৫. রাজা শশাঙ্কের রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ জেলার অন-র্গত কর্ণসুবর্ণ। ৬০৬ সালের আগেই তিনি একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি আমৃত্যু মগধ রাজ্য শাসন করেন।
৬. কোন সময়ে শশাঙ্ক গৌড়ের রাজা ছিলেন – ৭ম শতকে
৭. শশাঙ্কের সময় কণৌজের রাজা ছিলেন দেবগুপ্ত। তিনি শশাঙ্কের মিত্র ছিলেন।

থানেশ্বর (পূর্ব পাঞ্চাবে অবস্থিত)
৮. হর্ষবর্ধনের বংশের নাম পুষ্যভূমি। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরাগী ছিলেন।
৯. হর্ষবর্ধন (৬০৬-৬৪৭ সাল) এর ভ্রাতা রাজ্যবর্ধনকে শশাঙ্ক হত্যা করেন।
১০. হর্ষবর্ধন তার ভগ্নিপতির রাজ্য কণৌজও শাসন করতেন। এবং থানেশ্বর হতে কণৌজে রাজধানী স্খানান্তর করেন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর ৬৩৭ সালে হর্ষবর্ধন মগধে তার রাজ্য বিস্তার করেন। হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্যগুলো হল থানেশ্বর, কনৌজ, পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা।
১১. হর্ষবর্ধন বাণভট্ট, ময়ূর ভট্ট প্রমূখ কবিগণের পৃস্‌ঠপোষকতা করেন। তিনি নিজেই সুকবি ছিলেন। রত্নাবলী, নাগনন্দা প্রভূতি তার সংস্কৃত গ্রন্থ।
১২. চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৬৩০-৬৪৫ সালে ভারতে ছিলেন। বাংলায় আগমন ৬৩৮সালে।
১৩. হর্ষবর্ধন অপুত্রক ছিলেন। তার মৃত্যুর পর সমগ্র উত্তর ভারত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়।

পালবংশ (৭৫০-১১৭৫)
১. শশাঙ্কের মৃত্যুও পর তার দুর্বল উত্তরাধিকারীগনের মধ্যে আত্মকলহ, অনৈক্য ও বহিরাক্রমণের ফলে শতবর্ষব্যাপী (৬৫০-৭৫০) সমগ্র বঙ্গদেশে গভীর অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল। তদানীন্তন বঙ্গেও এই অরাজকতা পরিস্থিতিকে ‘মাৎস্যন্যায়’ বলে বর্ণনা করা হয়। এই অবস্থায় দেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ গোপাল নামক এক ব্যক্তিকে রাজা নির্বাচিত করেন। গোপাল (৭৫০-৭৭০) এর প্রতিষ্ঠিত বংশই পাল বংশ। তিনি ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ক্ষত্রিয়।
২. গোপালের মৃত্যুর পর তার পুত্র ধর্মপাল (৭৭০-৮১০) সিংহাসনে আরোহন করেন। তার সময়ে পাহাড়পুর ও সোমপুর বৌদ্ধ বিহার নির্মিত হয়।
৩. ধর্মপালের পুত্র দেবপাল (৮১০-৮৫০ সাল) এই বংশের সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাশালী রাজা ছিলেন।
৪. দেবপালের উত্তরাধিকারীদের দুর্বলতার সুযোগে পাল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন বংশী রাজা বিজয় সেন পালদিগকে বিতাড়িত করে উত্তর বঙ্গ জয় করেন।
৫. পাল বংশ প্রায় ৪০০ বছর যাবত রাজত্ব করে।
৬. ধর্মপাল রাজার রাজত্বকে বাঙালি জীবনের সুপ্রভাত বলা হয় –
৭. পাল রাজাদের আমলে বৌদ্ধ ধর্ম পুনরায় ব্যাপকতা লাভ করে। পাল যুগের পর বৌদ্ধ ধর্ম এদেশে সহজিয়া ধর্মরূপে জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

সেন আমল
১. এদের আদিভূমি দক্ষিণাত্যের কর্ণাটক। সেখানে তারা ব্রাহ্মণ ছিলেন, কালক্রমে তারা ক্ষত্রিয় বৃত্তি গ্রহণ করেন। তারা পালদের অধীনে চাকরি করেন। পালদের দুর্বলতার সুযোগে একাদশ শতাব্দীতে সামন্তসেন (১০৫০-১০৭৪সাল) এবং তার পুত্র হেমন্তসেন (১০৭৪-১০৯৭) পশ্চিমবঙ্গে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
২. হেমন্তসেনের পর তার পুত্র বিজয়সেন (১০৯৫-১১৫৮) সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন সেন বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে (রামপাল) তার দ্বিতীয় রাজধানী ছিল।
৩. বিজয়সেনের মৃত্যুর পর তার পুত্র বল্লাল সেন (১১৫৮-১১৭৯) বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। ঢাকার প্রথম মন্দির ঢাকেশ্বরী মন্দির বল্লাল সেন কর্র্তৃক নির্মিত। তিনি অদ্ভূত সাগর, দান সাগর গ্রন’ রচনা করেন। কৌলিন্য প্রথার প্রবর্তক ছিলেন তিনি।
৪. বল্লালসেনের পর তার পুত্র লক্ষণ সেন (১১৭৯-১২০৫) সিংহাসনে আরোহণ করেন। বর্তমান মালদহ জেলার গৌড় ছিল তার প্রধান রাজধানী। ইহার অপর নাম ছিল লক্ষণাবতী। নবদ্বীপ বা নদীয়ায় দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার রাজনিবাস ছিল নদীয়ায়। বিখ্যাত পন্ডিত হলায়ূদ তার প্রধানমন্ত্রী ও ধর্মাধ্যক্ষ ছিলেন।১২০৫ সালে তিনি মারা যান। তার পুত্র বিশ্বরূপ সেন (১২০৬-১২২৬) ও কেশব সেন (১২২৬-১২৩০) ঢাকার বিক্রমপুরে রাজধানী স্থাপন করে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেন। লক্ষণ সেনের আমলে ফরিদপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ছিল বঙ্গ। সেন বংশের সর্বশেষ রাজা ছিলেন লক্ষণ সেন। তিনি বাংলার শেষ হিন্দু রাজাও ছিলেন। লক্ষণ সেনের সময়ে বখতিয়ার খলজী বঙ্গ বিজয় করেন।কবি জয়দেব (গীতগোবিন্দ কাব্য রচনা করেন) লক্ষণসেনের অন্যতম সভাকবি ছিলেন।
৫. সেন আমলে পৌরণিক হিন্দু ধর্ম প্রবলরূপ ধারন করে। সেন বংশ ছিল বঙ্গদেশের সর্বশেষ স্বাধীন হিন্দুবংশ।
৬. শূলপাণি সেন রাজত্ব কালের একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন।