Share:

স্মৃতির ধারণ ক্ষমতার আর এক পরীক্ষা নাম মনে রাখা। সবচেয়ে কঠিন হল নাম মনে রাখার ক্ষমতা। সক্রোটিসের সময় এথেন্স শহরে দশ হাজার লোক বাস করতেন। সক্রেটিস এই দশ হাজার মানুষকে নামে চিনতেন। জনসংখ্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তির নাম জানা খুবই জরুরি। কারণ নাম শুধূ নাম নয়, কোনো ব্যক্তির সম্পূর্ণ পরিচিতি। আপনি যদি নাম ধরে বা আগে পরে মি: মিসেস বা বাবু বসিয়েও কাউকে বোঝাতে পারেন যে তাকে নামে চেনেন তাহলে সে গৌরব অনুভব করবে। তবে নিজের নামটি সকলের কাছে পরিচিত করে তোলা অর্থাৎ যাকে বলে নামডাক হওয়া বা স্বনামধন্য হওয়াটা দীর্ঘকাল ধরে ব্যাপক মিডিয়া-প্রচারের ওপর নির্ভর করে। এমন বহু লেখক আছেন দেশের ৯৫ ভাগ মানুষই যাঁকে জানে না। অথচ গত ৪০ বছর ধরে লিখেছেন। তাঁর বই-এর সংখ্যা একশো। কিন্তু তাঁর মিডিয়া পাবলিসিটি নেই।

অবশ্য সব নামই যে কারো স্মৃতিতে সারাজীবন থেকে যাবে তা নয়। যতক্ষণ প্রচারের আলো পড়াবে ততক্ষণই তাদের নাম লোকের মনে থাকবে। নাম প্রচারের প্রথম নিয়ম হচ্ছে নামটিকে আগে লোকের কাছে তুলেধরা। তারপর লোকের স্মৃতির দরজায় বার বার হাতুড়ি মেরে লোকের মনের ভেতর গেঁথে দেওয়া। এই হাতুড়ি মারাটাই হচ্ছে প্রচার। এজন্য ধর্মে নাম প্রচারই হল বড় ধরনের জনসংযোগ। রত্নাকরকে বার বার নাম জপ করতে বলা হয়েছিল। শ্রীচৈতন্য যে কীর্তন প্রবর্তন করেছিলেন, সেটা আর কিছু নয়। হরি তথা কৃষ্ণকে বার বার উচ্চরণ করে তাকে সাধারণের মনের মধ্যে গেঁথে দেওয়া। পরিচিতজনের নাম মনে রাখলে তারা প্রত্যেক ভেতরে ভেতরে গৌরব বোধ করে। সেই সঙ্গে স্মরণ ক্ষমতাও বাড়ে। ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে যত লোক চিনবে ততই আপনার জনপ্রিয়তা বাড়বে। চেনা বা Regression- সম্পর্কে আরও একটু বলি আপনি যে পাড়ায় থাকেন চোখ বুজে ওই পাড়ার একটি স্কেচ মনে মনে আঁকতে হবে কিন্তু বড় রাস্তা থেকে যে ছোট রাস্তা ধরে আপনার বাড়ি সেই রাস্তার পাশের প্রতিটি বাড়ির ছবিগুলি মনে করার চেষ্টা করুন। ১। প্রতিটি বাড়ির স্থাপত্য কী রকম? ২। প্রতিটি বাড়ির রঙ কি রকম ? ৩। কোন বাড়ি একতলা, কোন বাড়ি দোতলা-তিনতলা ? ৪। কোন বাড়ির সামনে কী কী বড় গাছ আছে? ৫। কোন বাড়ির পাশে প্লট আছে?

এইবার চোখ বুজে যে ছবিটা ভেবেছিলেন আগামীকাল ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় সেটা বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। দেখবেন বাস্তবের সঙ্গে অনেক অসঙ্গতি ধরা পড়ছে। আপনি হয়তো ভেবেছিলেন ওই বাড়িটার রং কমলা, কিন্তু গিয়ে দেখলেন ওটা গৈরিক। আবার যে বকুল গাছটাকে ভেবেছিলেন ১২নং বাড়ির সামনে, সেটি আসলে ১৪নং বাড়ির সামনে।

দীর্ঘ দুবছর পরে ধরুন আবিস্কার করলেন বন্ধুটি ন্যাটা। বাঁ হাত দিয়ে সব কাজ সারেন। অথবা তার আঙুলে একটি পলা আছে আপনি এতদিন খেয়াল করেননি। আমার যে মাথায় টাক সেটা সবাই জানে। অনেকে সেটা উপভোগ করে, ইষৎ ব্যঙ্গও করে। কিন্তু আমার চোখের নীচে একটা তিল আছে, সেটা কিন্তু আমার অনেক অন্তরঙ্গ বন্ধুরও খেয়াল নেই। কোন বিশেষ মানুষ, কোনো বিশেষ বাড়ি বা কারো ঘর, সিনেমা হলের ইন্টিরিয়ার, রেলের কামরা পর্যবেক্ষণ করার সময় খুব ডিটেলে পর্যবেক্ষণ করলে ও সেই পর্যবেক্ষণ করার সময় খুব ডিটেলে পর্যবেক্ষণ করলে ও সেই পর্যবেক্ষণ মনে রেখে দিলে যেমন পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়ে তেমনি স্মৃতি ধারণ ক্ষমতা ও বাড়ে। কোনো মানুষের সঙ্গে প্রথম আলাপের সময়ই যদি তাঁর মুখের ফিচার, কথা বলার ধরন, হাঁটার স্টাইল, পোশাক-আশাকের নির্বাচন ও সেই সঙ্গে তাঁর নাম খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে তাঁর নাম ও মুখ কিছুতেই ভূলবে না।

তেমনি পড়ার সময় যে বই পড়বেন সেই বইটির লেখকের নাম (বানান সহ) বইটির মলাট (কী কী রং, কী ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, প্রকাশকের নাম) যদি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে বইটি স্মৃতির ভান্ডারে জমা থাকবে। এইবার সেই পাতায় মুখস্থ রাখার অংশটুকু মার্কার দিয়ে দাগিয়ে দিন। এইবার তিন-চারবার ওই অংশ পড়ুন। যখন প্রশ্নোত্তর স্মরণে আনবেন তখন পুরো বইটি ও ওই বইয়ের বিশেষ পাতাটি মনে করার চেষ্টা করবেন। দেখবেন মার্কারে দাগানো অংশটি আপনার স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠেছে।