Warning: session_set_cookie_params(): Cannot change session cookie parameters when session is active in /home/kajkhuji/public_html/includes/theme/head.php on line 2
KajKhuji - বাংলাদেশের যা কিছু সেরা

বাংলাদেশের যা কিছু সেরা

Category: Bangladesh
Posted on: Wednesday, September 20, 2017

Share:

স্থাপনা

জাতীয় স্মৃতিসৌধ
জাতীয় স্মৃতিসৌধ স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরবের প্রতীক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্দদানকারী বীর শহীদদের স্মরণে জাতির শ্রদ্ধা নিবেদনের চিরন্তন প্রতীক জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এটি সাভার উপজেলায় ৪৪ হেক্টর জায়গা নিয়ে স্থাপন করা হয়। স্থাপত্যশৈলীর দিক দিয়ে স্মৃতিসৌধ অনন্য। যা দেখে যে কারও মন জুড়িয়ে দেবে। জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য ১৯৭৮ সালের জুন মাসে প্রাথমিক পর্যায়ে নকশা জমা দেওয়ার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ৫৭টি সেরা নকশার মধ্য থেকে স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেনের নকশাকে নির্বাচন করা হয়। ১৯৮২ সালের কিছু পর স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামো, কৃত্রিম লেক আর উদ্যান তৈরির কাজ শেষ হয়। সৌধের মূলকাঠামো সাত জোড়া ত্রিভূজাকৃতির দেয়াল নিয়ে গঠিত। দেয়ালগুলো ছোট থেকে বড় এই ক্রমে সাজানো হয়েছে। সর্বোচ্চ বিন্দুতে সৌধটি ১৫০ ফুট উঁচু। এই সাতজোড়া দেয়াল স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি প্রধান পর্যায়কে নির্দেশ করে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬-এর শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয়দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ।

জাতীয় সংসদ ভবন
জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মূল কেন্দ্র। এই সংসদ ভবনে বসে নির্বাচিত সদস্যরা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন প্রণয়ন করেন। ২০৮ একর জমির ওপর নির্মিত ভবনটি উদ্বোধন করা হয় ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি। উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার। আমেরিকান নাগরিক লুই আই কান ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনের নকশাবিদ ও স্থপতি। তিনি সংসদ এলাকার সমগ্র নকশাও করেছিলেন। তিনি সংসদ ভবনের মূল কাঠামোর স্থায়িত্বের জন্য মূল ভবনের সঙ্গে লেকের ব্যবস্থা করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনটি বিশ্বের দৃষ্টিনন্দন ভবনগুলোর অন্যতম।
তিন তলাবিশিষ্ট বিশাল এই ভবনের নির্মাণকাজে তখন ব্যয় হয়েছিল ১৯৭ কোটি টাকা। সংসদ ভবনের ছাদ ও দেয়ালের স্ট্রাকচারাল নকশা করেন হ্যারি ব্লুম। এর দেয়ালের ব্যাস ১২ ফুট থেকে ২ ফুট। সংসদ ভবনের উচ্চতা ১৫৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। কার্পেট এরিয়া ২ লাখ ৫০ হাজার ঘনফুট। প্যাসেজ ও করিডোর ২ লাখ ৮৭ হাজার ঘনফুট। টয়লেট ও ডাস্ট ৯০ হাজার ঘনফুট। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এলাকা ৪ লাখ ৮৬ হাজার ঘনফুট। দরজা রয়েছে ১ হাজার ৬৩৫টি, জানালা রয়েছে ৩৩৫টি।

ঐতিহাসিক

মহাস্থানগড়
বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরাতন নগরী মহাস্থানগড়। প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে এখানে।
বগুড়া শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে গেলে এই শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের শহর মহাস্থানগড় সে সময় এর নাম ছিল পুণ্ড্রনগর। বৌদ্ধ শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ হওয়ায় চীন ও তিব্বত থেকে ভিক্ষুরা তখন লেখাপড়া করতে মহাস্থানগড়ে আসতেন। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজধানী শহর হচ্ছে মহাস্থানগড়। প্রাক মৌর্য যুগ, মানে প্রায় আড়াইহাজার বছর আগ থেকে এখানে মানব বসতির চিহ্ন পাওয়া যায়। এ ছাড়া মহাস্থানগড়ে পাওয়া বিভিন্ন প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন থেকে জানা যায়, কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত এবং পাল শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ছিল এটি।

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার
নওগাঁর ঐতিহাসিক নিদর্শন পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার। এটি নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নে অবস্থিত। এখানে রয়েছে নানা ধ্বংসাবশেষের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন একটি ভগ্নমন্দির। এই মন্দির অতি বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয়। তিব্বতীয় ইতিহাস থেকে জানা যায়, দেবপাল এই সোমপুর বিহার (বৌদ্ধ মঠ) নির্মাণ করেন। তবে পাল রাজত্বের প্রথম ভাগে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে এটি নির্মাণের দাবি করা হয়। পাহাড়পুরে প্রাচীন ও বৃহত্তম বৌদ্ধমঠের ধ্বংসাবশেষ প্রায় ২৭ একরেরও এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। পাহাড়পুরের ধ্বংসস্তূপ থেকে যে ফলকচিত্র পাওয়া গেছে, সেগুলো খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। পাহাড়পুর বিহারটি উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৯২২ ফুট দীর্ঘ এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৯১৯ ফুট প্রশস্ত।

পোশাক

মসলিন
মসলিন বাংলাদেশের কাপড় ও পোশাকের অহংকার। মসলিন এখন দেখাই যায় না। অথচ একসময় বাংলার মসলিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। কয়েক হাজার বছর আগে মসলিনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। তবে অনেক ইতিহাসবেত্তা বলেছেন, গ্রিক, আর্মেনিয়ান ও আরব্যের বণিকরা মসলিনের ব্যবসা করত। গ্রিসে ছিল মসলিনের বড় ব্যবসা। মসলিনের সুনাম সারা বিশ্বেই ছিল। বাংলার মসলিনের বিশেষত্ব ছিল এটি ওজনে একেবারেই হালকা ও পাতলা ছিল। সোনারগাঁও ছিল মসলিন কাপড় তৈরির জন্য সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। বিদেশি বণিকরা এখানে জাহাজ নিয়ে ভিড়ত। প্রাচীন নদী-বন্দর সোনারগাঁও তখন উল্লেখযোগ্য নদীবন্দর। সে সময়ে সারা বিশ্বে বিক্রির জন্য মসলিন নিতে ভিড় করত ব্যবসায়ীরা। তখন বাংলাদেশে এক ধরনের উন্নত কার্পাস তুলা উৎপন্ন হতো। সেই তুলা দিয়ে তৈরি করা হতো মসলিনের সুতা। মসলিনের কারিগরদের কদরও ছিল খুব। কথিত আছে, ঝিনুকের খোলের ভেতর শত শত গজ মসলিন কাপড় নিয়ে যাওয়া হতো। ১৭৫ গজ মসলিন কাপড় একত্রিত করলে একটি কবুতরের ডিমের মতো হতো।

জামদানি
জামদানি কাপড়ের শাড়ির খ্যাতি অনেকেই শুনেছেন। মিহি সুতার তৈরি এ শাড়ি দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি গুণগত মানেও সেরা। জামদানি কার্পাস তুলা দিয়ে প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙালি নারীদের অতি পরিচিত। মসলিনের ওপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয়। এই নকশা মসলিন শাড়িকে করে তোলে অনন্য। জামদানি বলতে সাধারণত শাড়িকেই বোঝানো হয়। তবে জামদানি দিয়ে নকশী ওড়না, কুর্তা, পাগড়ি, রুমাল, পর্দা ইত্যাদি তৈরি করা হতো। ১৭০০ শতাব্দীতে জামদানি দিয়ে নকশাওয়ালা শেরওয়ানির প্রচলন ছিল। জামদানির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায়, আনুমানিক ৩০০ খ্রিস্টাব্দে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে। ঐতিহাসিক বর্ণনা, শ্লোক প্রভৃতিতে দেখা যায় মসলিনে নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হতো। ঢাকা জেলার সোনারগাঁও, ধামরাই, তিতাবাড়ী, বাজিতপুর, জঙ্গলবাড়ী প্রভৃতি এলাকা মসলিনের জন্য সুবিখ্যাত ছিল। এ কারণে এখানেই জামদানির বিস্তার ঘটে। এখনো স্বল্প পরিসরে জামদানি শাড়ি পাওয়া যায়।

পর্যটন

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত
পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত অলঙ্কৃত করেছে বাংলাদেশকে। কক্সবাজারের এই প্রাকৃতিক বিস্ময় মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায় সৌন্দর্যে। সমুদ্রস্নানের সুযোগ তো রয়েছেই এ ছাড়া উত্তাল সমুদ্রে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের দৃশ্য মানুষকে আবেগ তাড়িত করে তোলে। পূর্ণিমার রাতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের তুলনা পৃথিবীর আর কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনা চলে না। ইংরেজ ক্যাপ্টেন মি. হেরাম কঙ্রে নামানুসারে জায়গাটির নামকরণ করা হয় কক্সবাজার। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের দৈর্ঘ্য ১২০ কিলোমিটার। রুপালি সৈকতের সঙ্গে সমুদ্রের তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা সংরক্ষিত বনভূমিসমৃদ্ধ ৯৬ কিলোমিটার পাহাড়ের সারি এখানকার অন্যতম বিরল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বলে বিবেচিত।

সুন্দরবন
অপরূপ সুন্দরবন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন এটি। সুন্দরবন নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে ভীষণ প্রিয় বেড়ানোর জায়গা। এখানে নানান জাতের পাখি দেখার পাশাপাশি দেখা মিলবে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের। প্রায় ৪৫০টি নদ-নদী ও খাল বিধৌত সুন্দরবনে রয়েছে সুন্দরী, গেওয়া, পশুর, গরান, বাইন, হেতাল, টাইগার ফার্ন, ছন, গোলপাতাসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা-গুল্ম-লতা-অর্কিড-শৈবাল। বন্যপ্রাণীর বৃহত্তম আবাসস্থল সুন্দরবনে আছে অন্তত ২৬৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। এ ছাড়া আছে চিত্রল ও মায়া হরিণ, শূকর, লোনা পানির কুমির, অজগর, রাজগোখরা, কচ্ছপ, উদবিড়াল, বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতী ডলফিনসহ নানা রকম প্রাণী।

চলনবিল
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিলের নাম চলনবিল। তিন জেলা নিয়ে বিস্তৃতি। নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার বিস্তৃত অংশজুড়ে যে জলভূমি বর্ষা এবং বর্ষা-পরবর্তী সময়ে দেখা যায় তা-ই বিখ্যাত চলনবিল। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলনবিল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়।
ব্রহ্মপুত্র নদ যখন তার প্রবাহপথ পরিবর্তন করে বর্তমান যমুনায় রূপ নেয়, সে সময়ই চলনবিলের সৃষ্টি। সৃষ্টির সময় চলনবিলের মোট আয়তন ছিল প্রায় এক হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে এই বিলের আয়তন অনেক কমে এসেছে। চলনবিল মূলত অনেক ছোট ছোট বিলের সমষ্টি। বর্ষায় এতে জলপ্রবাহ বেড়ে একসঙ্গে বিশালাকার এক বিলের সৃষ্টি হয়। এই বিল পর্যটকদের বিমোহিত করে।

খাবার

কুমিল্লার রসমালাই
কুমিল্লার রসমালাই অপ্রতিদ্বন্দ্বী ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে। শুধু কুমিল্লাই নয়, গোটা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও পাড়ি জমাচ্ছে এই রসমালাই। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে রসমালাই তার রসে মাতোয়ারা করে রেখেছে মিষ্টিপ্রেমীদের। প্রথমে এর নাম ছিল ক্ষীরভোগ। পূর্ব পাকিস্তান হওয়ার পর অবাঙালিরা কুমিল্লায় এসে ক্ষীরভোগকে রসমালাই বলতে শুরু করে। এখনো কুমিল্লার মনোহরপুরে রসমালাই দোকানের সামনের রাস্তায় মানুষের লাইন পড়ে যায়। কুমিল্লা শহরে আসল রসমালাই মেলে মাতৃভাণ্ডার, ভগবতী পেড়া ভাণ্ডার ও শীতল ভাণ্ডারে। মনোহরপুর কালীবাড়ির সামনে মাতৃভাণ্ডার, ভগবতী পেড়া ভাণ্ডার ও শীতল ভাণ্ডারের অবস্থান। এ ছাড়া শহরে পোড়াবাড়ী সুইটস, জলযোগ, জেনিস সুইটসে ভালো মানের রসমালাই তৈরি হচ্ছে। গরুর খাঁটি দুধ ছাড়া রসমালাই তৈরি সম্ভব নয়। রসমালাইয়ের কারিগররা জানান, কুমিল্লার বাইরে ‘কুমিল্লার রসমালাই’ বলে বিক্রি করা হলেও কুমিল্লার মতো ভালো কারিগর না থাকায় আসল রসমালাইয়ের স্বাদ পাওয়া যায় না। দুধ, চিনি আর অল্প ময়দার সমন্বয়ে তৈরি হয় রসমালাই।

বগুড়ার দই
বগুড়া দই। দই বলতে নিশ্চয়ই সবার আগে আসে নামটি। বগুড়ার দইয়ের সুনাম দেশের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বগুড়ার দইয়ের স্বাদ নিতে যে কেউ আগ্রহী হয়ে উঠেন। বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস বেশ পুরনোই বলা চলে। আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে ঘোষ নামে পরিচিত পরিবারগুলো এই শিল্পের সূচনা করে। তবে শেরপুরের গৌর গোপাল ছিলেন এই দইয়ের প্রতিষ্ঠাতা। সময়ের বিবর্তনে ক্রমেই জনপ্রিয় হতে থাকে বগুড়ার দই। ঘোষ পরিবারের পাশাপাশি অনেকে দই শিল্পের প্রসারে এগিয়ে আসেন। এর মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানটি দাঁড় করান মহরম আলী। যে মহরম দই বর্তমানেও বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান আকবরিয়া হোটেলও দই ব্যবসায় এগিয়ে আসে। ১৯৮৫ সালে আহসানুল কবির তার ‘দইঘর’ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দইশিল্পে নিয়ে আসেন আধুনিকায়ন। দই তৈরির প্রক্রিয়া, প্যাকিং এবং বিপণনে তার প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি দইশিল্পের নতুন সম্ভাবনা খুলে দেয়। স্বাদের উন্নতি এবং পরিবহনের সুবিধাজনক পদ্ধতির কারণে বগুড়ার দই ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।

টাঙ্গাইলের চমচম
মিষ্টি ছাড়া বাংলাদেশিদের উৎসবই যেন জমে না। মিষ্টির কথা উঠলে টাঙ্গাইলের চমচমের প্রতিদ্বন্দ্বী হুট করে বলে দেওয়াটা রীতিমতো অসম্ভব। দেখতে অনেকটা লম্বাটে আকৃতি আর শরীরে মাওয়া জড়ানো মিষ্টির নাম চমচম। হালকা আঁচে পোড় খাওয়া এই মিষ্টির রং গাঢ় বাদামি বা লালচে। বাহিরটা একটু শক্ত হলেও এর ভেতরটা কিন্তু একদম রসে ভরপুর। ব্রিটিশ শাসনামলে দশরথ গৌড় নামের এক ব্যক্তি টাঙ্গাইলের যমুনা-তীরবর্তী পোড়াবাড়ীতে এসে বসতি গড়েন। আসাম থেকে এসে দশরথ গৌড় যমুনার সুস্বাদু মৃদু পানি ও এখানকার গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে প্রথম তৈরি করেন এক ধরনের বিশেষ মিষ্টি। লম্বাটে আকৃতির এ মিষ্টির নাম দেন তিনি চমচম। একেবারে মাত্রা মতো মিষ্টি, ঘন রস আর টাটকা ছানার গন্ধমাখা পোড়াবাড়ীর এই মিষ্টির স্বাদ সত্যি অতুলনীয়। পোড়াবাড়ী বাজারের আশপাশের কয়েকটি বাড়িতে এখনো তৈরি হয় খাঁটি মানসম্পন্ন চমচম। এ ছাড়া খাঁটি মানের চমচম পাওয়া যায় টাঙ্গাইলের কালীবাড়ি বাজারের মিষ্টির দোকানগুলোতেও। খোকা ঘোষের জয়কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এদের মধ্যে অন্যতম।

নাটোরের কাঁচাগোল্লা
নাটোররের কাঁচাগোল্লার নাম শোনেননি এমন মানুষ বোধহয় এ দেশে নেই। বাংলাদেশে সুস্বাদু মিষ্টি জাতীয় খাবারের কথা উঠলে নাটোরের কাঁচাগোল্লার নাম উঠে আসে। কাঁচাগোল্লার কারণে নাটোরকে মানুষ একনামে চিনে। একবার যে নাটোরের কাঁচাগোলার স্বাদ নিয়েছে তাকে এ সুস্বাদু মিষ্টি খেতে বার বার টানবে। নাটোরের কাঁচাগোল্লা নাটোরের বনলতা সেনের মতোই আলোচিত, সমাদৃত। কাঁচাগোল্লা গোল নয়, লম্বা নয়, আবার কাঁচাও নয়। তবুও নাম তার কাঁচাগোল্লা। এ নামেই পরিচিতি দেশে-বিদেশে। আনুমানিক আড়াইশ বছর আগেও নাটোরের কাঁচাগোল্লার কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। তবে ১৭৫৭ সাল থেকে এই মিষ্টি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে। কাঁচা ছানা রসে ডোবানো হয় বলেই এর নাম দেওয়া হয়েছিল কাঁচাগোল্লা। কাঁচাগোল্লার স্বাদ রসগোল্লা, পানতোয়া, এমনকি অবাক সন্দেশকেও হার মানিয়ে দেয়। এতে একটি মিষ্টি কাঁচা ছানার গন্ধ পাওয়া যায়, যা অন্য কোনো মিষ্টিতে পাওয়া যায় না। জয় কালীবাড়ি দ্বারিক ভাণ্ডারে মিলবে খাঁটি কাঁচাগোল্লা। নাটোর যাবেন আর কাঁচাগোল্লা খাবেন না, এ ভুল যেন কোনোভাবেই মার্জনীয় নয়।

মাছের রাজা ইলিশ
সুস্বাদু ইলিশ ভাজা আর গরম ভাত। এ দুইয়ের সম্মিলন বাঙালির খাবারকে পরিপূর্ণতা দেয়। ইলিশের স্বাদ যে একবার পেয়েছে সে চাইলেও কোনো দিন ভুলতে পারবে না। এতই সুস্বাদু এই ইলিশ। পদ্মার ইলিশের স্বাদ জিভে লাগানোর অভিজ্ঞতার তুলনা হয় না। বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষের দিনটিও শুরু হয় পান্তা আর ইলিশ দিয়ে। ইলিশ ছাড়া নববর্ষের উৎসব যেন অপূর্ণই থেকে যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও কলকাতার বেশির ভাগ শাশুড়ি তাদের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী জামাইষষ্ঠীর দিনে স্নেহের জামাইকে পদ্মার ইলিশ পাতে তুলে দেন। রুপালি রঙের ইলিশের জাদুকরী স্বাদ এমনই। সরষে ইলিশ, ইলিশ পাতুরি, ইলিশ ভাজা- হরেক পদের রান্না, হরেক রকম স্বাদ। ইলিশের সুঘ্রাণ ভোজনরসিককে পাগল করে দিতে যথেষ্ট। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় এক কোটি প্রবাসী বাঙালিও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ইলিশ খেতে ভোলেন না। ইলিশ বাংলাদেশের মাছ। ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইরানসহ আরও কয়েকটি দেশের উপকূলে ইলিশ ধরা পড়ে। সুস্বাদু ইলিশের আবাস বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে। সে নদীতে এখন পানি নেই। সেখানে পানির বদলে বালুচর। অথচ আগের দৃশ্য ছিল মনোহর। নদী পদ্মা তখন বিপুল জলরাশি নিয়ে সগর্জনে প্রবাহিত হতো। নদীর বুকে ঝাঁক বেঁধে তখন সাঁতার কেটে বেড়াত লাখো-কোটি রুপালি ইলিশ। ইলিশে ইলিশময় থাকত বাংলার হাটবাজার। এক সময় ধরা পড়ত কম, কিন্তু ছোট-বড় নদ-নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য ছিল। এমনকি বড় খালেও জাল ফেললে দু-একটি ইলিশ উঠে আসত। তখন দুই-তিন কেজি পর্যন্ত আকার হতো একেকটি ইলিশের। বছরে দুই লাখ টনের জায়গায় এখন পৌনে চার লাখ টন ইলিশ ধরা পড়ছে, কিন্তু বড় আকারের ইলিশের দেখা পাওয়া দুষ্কর। এমনকি আধুনিক ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে সাগরে গিয়েও ধরে আনা হচ্ছে ইলিশ। মাছে-ভাতে বাঙালি সন্তানদের হাজার বছরের ইতিহাসে, ঐতিহ্যবাহী ইলিশ মাছের রসনাতৃপ্তিতে কোনো দিন ছন্দপতন ঘটেনি। ইলিশের অভাব কখনো দেখা দেয়নি বাংলায়। কিন্তু সে দিন অতীত হয়েছে। এত স্বাদের মাছটি দিন দিন হয়ে যাচ্ছে দুষ্প্রাপ্য, দুর্মূল্য। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বছরে যে পরিমাণ জাটকা ধরা হয় তার অর্ধেক রক্ষা করা গেলেও ইলিশের উৎপাদন ৫০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব।

রয়েল বেঙ্গল টাইগার
রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বাংলাদেশের জাতীয় পশু। রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুন্দরবনের প্রধান সৌন্দর্য। বেঙ্গল টাইগারের মতো সুন্দর ও ক্ষীপ্রগতির বাঘ পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। হলদে ডোরাকাট রং এই বাঘকে অন্যসব প্রজাতির বাঘ থেকে করেছে আলাদা ও অনন্য। ভারত-বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকার বাসিন্দা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। পঞ্চাশের দশকেও বর্তমান মধুপুর এবং ঢাকার গাজীপুর এলাকায় এই বাঘ দেখা যেত। মধুপুরে সর্বশেষ দেখা গেছে ১৯৬২ এবং গাজীপুরে ১৯৬৬ সালে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার বর্তমানে সারা বিশ্বে ৩০০০-এর মতো আছে। তন্মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে। ২০০৪ সালের বাঘ শুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৪৫০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। বাংলাদেশে এই বাঘের প্রধান আবাসস্থল সুন্দরবন। বাংলাদেশ ছাড়াও এদের বিচরণ রয়েছে ভারতের সুন্দরবন অংশে, নেপাল ও ভুটানে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গায়ের রং হলুদ থেকে হালকা কমলা রঙের হয় এবং ডোরার রং হয় গাঢ় খয়েরি থেকে কালো। পেটটি হচ্ছে সাদা এবং লেজ কালো কালো আংটিযুক্ত সাদা। লেজসহ একটি নর বাঘের দৈর্ঘ্য ২১০-৩১০ সে.মি. যেখানে মাদিদের দৈর্ঘ্য ২৪০-২৬৫ সে.মি.। পুরুষ বাঘের গড় ওজন হচ্ছে ২২১.২ কেজি এবং নারী বাঘের ওজন হচ্ছে ১৩৯.৭ কেজি। গড়ে বেঙ্গল টাইগাররা সাইবেরিয়ান বাঘের চেয়ে বড়। একটি বেঙ্গল টাইগারের গর্জন ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত দূর থেকে শোনা যায়। বাংলাদেশে সুন্দরবনই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শেষ আশ্রয়স্থল। মানুষের অগ্রাসনে গোলপাতার ঝোঁপ আর গাছ যেভাবে কমে যাচ্ছে, তাতে বাঘের বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খাদ্যঘাটতি দেখা দিচ্ছে জঙ্গলের ভিতরে। এভাবে ক্রমে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিলুপ্তির হুমকিতে অবস্থান করছে। এ ছাড়া যোগ হয়েছে বনদস্যু বাহিনীর উৎপাত। যে কারণে মারাত্দক হুমকির মুখে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী প্রাণীটি। একদিকে চোরা শিকারি অন্যদিকে বনদস্যু। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে বাঘ শূন্যতার কারণে সুন্দরবন বিরান ভূমিতে পরিণত হবে, এতে সন্দেহ নেই। সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে খ্যাত বাঘের এই দৈন্যতা রুখতে সচেতন মানুষরা এগিয়ে আসছে। বিভিন্ন সংগঠন ও সরকার এ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সুন্দরবনের বাঘ রক্ষা করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।