Share:

মােবাইল ফোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ও উন্নয়নের এক একটি পর্যায় বা ধাপকে মােবাইল ফোনের প্রজন্ম নামে অভিহিত করা হয়। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত মােবাইল প্রযুক্তিকে চারটি প্রজন্মে ভাগ করা যায়। নিচে এসব প্রজন্ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলােচনা করা হলাে। 

প্রথম প্রজন্ম (First Generation-1G) 
১৯৮৩ সালে উত্তর আমেরিকায় বাণিজ্যিক ভাবে প্রথম প্রজন্ম মােবাইল ফোন চালু করা হয় যার নাম ছিল AMPS (Advanced Mobile Phone System)। AMPS এনালগ সিগন্যাল ব্যবহার করে যােগাযােগ স্থাপন করত। FDMA (Frequency Division Multiple Access) পদ্ধতির মাধ্যমে এর লিংক (Link) এর চ্যানেলগুলাে আলাদা করা হয়। এই সিস্টেম দুটি এনালগ চ্যানেল ব্যবহার করে যথা-ফরােয়ার্ড (Forward) এবং রিভার্স (Reverse)। বেস স্টেশন হতে মােবাইল স্টেশনকে বলে ফরােয়ার্ড। মােবাইল হতে বেস স্টেশনকে বলে রিভার্স। এছাড়া প্রথম জেনারেশনে CT/1এবং NMT নামে আরও দুইটি মােবাইল ফোন সিস্টেম চালু ছিল। 

প্রথম প্রজন্মের মােবাইল সিস্টেমের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য রয়েছে

  • এই প্রজন্মে এনালগ পদ্ধতির রেডিও সিগন্যাল ব্যবহৃত হয়।
  • সেল সিগন্যাল এনকোডিং পদ্ধতি হলাে এফডিএমএ(Frequency Division Multiple Access-FDMA)।
  • সমসাময়িক কালের সাধারণ টেলিফোনের তুলনায় মােবাইল ফোনসমূহ আকারে ছােট এবং ওজনে হালকা। 
  • এ সিগন্যাল ফ্রিকোয়েন্সি তুলনামূলকভাবে কম। 
  • কথােপকথন চলা অবস্থায় ব্যবহারকারীর অবস্থানের পরিবর্তন হলে ট্রান্সমিশন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
  • এতে মাইক্রোপ্রসেসর এবং সেমি কন্ডাক্টর প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।
  • একই এলাকায় অন্য মােবাইল ট্রান্সমিটারের দ্বারা সৃষ্ট রেডিও ইন্টারফারেন্স নেই। 

উদাহরণ : এডভান্সড মােবাইল ফোন সিস্টেম (Advanced Mobile Phone System-AMPS), নর্ডিক মােবাইল টেলিফোন (Nordic Mobile Telephone), টোটাল একসেস কমিউনিকেশন সিস্টেম (Total Access Communication System-TACS) ইত্যাদি। 

দ্বিতীয় প্রজন্ম (Second Generation-2G) 
ভয়েসকে Noise মুক্ত করার মাধ্যমে দ্বিতীয় প্রজন্ম মােবাইল ফোনের আবির্ভাব ঘটে। এটি ভয়েস ট্রান্সমিট করে ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে। উত্তর আমেরিকার AMPS এর নামের সাথে ডিজিটাল যােগ করে নাম রাখা হয় Digital AMPS বা D-AMPS। D-AMPS FDMA এবং TDMA পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ সময় CDMA (Code Division Multiple Access) নামে নতুন ডিজিটাল পদ্ধতির উদ্ভাবন ঘটে। এছাড়া দ্বিতীয় জেনারেশনের মােবাইল ফোন আরও যে সব সিস্টেম ব্যবহার করে তাদের নাম হলাে CT2, IS-136, TDMA, GSM, PDC, IS-95, cdmaOne. এর মধ্যে IS-95 এবং cdmaOne হলাে CDMA পদ্ধতি।

দ্বিতীয় প্রজন্মের মােবাইল সিস্টেমের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য রয়েছে

  • এই প্রজন্মে ডিজিটাল পদ্ধতির রেডিও সিগন্যাল ব্যবহৃত হয়।
  • সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং মাইক্রোওয়েভ ডিভাইসের অগ্রগতির ফলে মােবাইল কমিউনিকেশনে ডিজিটাল ট্রান্সমিশন সম্ভব হয়।
  • উন্নতমানের অডিও এর জন্য ডিজিটাল মডুলেশন (Modulation) ব্যবহৃত হয়।
  • সেল সিগন্যাল এনকোডিং পদ্ধতি হলাে এফডিএমএ(FDMA), টিডিএমএ('TDMA) ও সিডিএমএ(CDMA)
  • ডেটা স্থানান্তর করার গতি অনেক বেশি।
  • ডেটার প্রতারণা প্রতিরােধে সহায়তা করে।
  • সর্বপ্রথম প্রিপেইড পদ্ধতি চালু হয়।
  • সীমিতমাত্রায় আন্তর্জাতিক রােমিং সুবিধা চালু হয়। 
  • মােবাইল ডেটা স্থানান্তরের জন্য প্যাকেট সুইচ নেটওয়ার্ক এবং ভয়েস কল রূপান্তরের জন্য কোর সুইচ নেটওয়ার্ক পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
  • এমএমএস (MMS-Multimedia Message Service) এবং এসএমএস (SMS-Short Message Service) সেবা কার্যক্রম চালু হয়।
  • জিএসএম পদ্ধতিতে ডেটা এবং ভয়েস প্রেরণ করা সম্ভব হয়।
  • কথােপকথন চলা অবস্থায় ব্যবহারকারীর অবস্থানের পরিবর্তন হলে ট্রান্সমিশন অবিচ্ছিন্ন থাকে।
  • ক্ষেত্র বিশেষে অন্য মােবাইল সার্ভিস প্রােভাইডারের ট্রান্সমিটারের দ্বারা সৃষ্ট রেডিও ইন্টারফারেন্স হয়। 

উদাহরণ : জিএসএম৯০০, জিএসএম-আর, জিএসএম১৮০০, জিএসএম১৯০০, জিএসএম&০০, Digital AMPS (D-AMPS), CDMA, Personal Digital Communication (PDA) ইত্যাদি

তৃতীয় প্রজন্ম (Third Generation-3G) 
তৃতীয় প্রজন্ম মােবাইল ফোনের ধারণা শুরু হয় ১৯৯২ সাল থেকে। এ সময় ইন্টারন্যাশনাল টেলিকম ইউনিয়ন (ITU) “Internet Mobile Communication for year 2000" নামে নতুন ধারণার উদ্ভব ঘটায়। এর ধারণাগুলাে ছিলও 

  • ভয়েস মান (Voice Quality) পাবলিক টেলিফোন নেটওয়ার্কের (Public Telephone Network) মতাে হবে। 
  • ৩ এর ডেটা রেট হবে-চলন্ত গাড়ির জন্য ১৪৪ কিলােবিট/সেকেন্ড, হেটে চলা মানুষের জন্য ৩৮৪ কিলােবিট/সেকেন্ড এবং ঘরে ব্যবহারের জন্য ২ মেগাবিট/সেকেন্ড। 
  • এর ব্যান্ডউইথ (Bandwidth) হবে ২ মেগাহার্জ। 
  • ইন্টারনেট সংযােগের ব্যবস্থা থাকবে। 

২০০১ সালে জাপানের NTT DOCoMo প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে ৩য় প্রজন্মের মােবাইল ফোন ব্যবহার শুরু করেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের স্ট্যান্ডার্ড CDMA টেকনােলজির এর পরিবর্তে W-CDMA (Wideband Code Division Multiple Access) টেকনােলজির ব্যবহার দিয়ে তৃতীয় প্রজন্মের সূচনা হয়। W-CDMA পদ্ধতি বর্তমানে UMTS (Universal Mobile Telecommunication System) নামে পরিচিত। তৃতীয় প্রজন্মে উচ্চ গতির ডেটা ট্রান্সফার ও মাল্টিমিডিয়া ডেটা ব্যবহারসহ CDMA ও GPRS(General Packet Radio Service) স্ট্যান্ডার্ডের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। ফলে সর্বাধিক ডেটা ট্রান্সফারের মােবাইল টেকনােলজি EDGE(Enhanced Data rates for GSM Evolution) চালু হয়। এই প্রজন্মেই আধুনিক মােবাইল টেকনােলজি HSPA(High Speed Packet Access) এর বাস্তবায়ন করা হয়।

তৃতীয় প্রজন্মের মােবাইল সিস্টেমের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য রয়েছে

  • ডেটা রূপান্তরের কাজে প্যাকেট সুইচিং ও সার্কিট সুইচিং উভয় পদ্ধতিই ব্যবহৃত হয়। তবে প্যাকেট সুইচিং পদ্ধতির সাহায্যে খুব দ্রুত ছবি ও ভয়েস আদান প্রদান করা যায়। 
  • মডেম সংযােজনের মাধ্যমে মােবাইল ফোনে ইন্টারনেটের ব্যবহার এবং ডেটা আদান-প্রদানের নতুন এক মাত্রা যােগ হয়। 
  • EDGE (Enhanced Data Rates for Global Evolution) পদ্ধতি কার্যকর হয়। ফলে অধিক পরিমাণ ডেটা স্থানান্তর সম্ভব হয়। 
  • ডেটা স্থানান্তর উচ্চগতি সম্পন্ন। 
  • ডেটা রেট ২ এমবিপিএস এর অধিক। 
  • মােবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স ইত্যাদি সেবা কার্যক্রম চালু সম্ভব হয়।
  • এক্ষেত্রে GSM, EDGE, UTMS এবং CDMA 2000 প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। 
  • রেডিও ফ্রিকোয়েসী W-CDMA বা UMTS স্ট্যান্ডার্ড। 
  • চ্যানেল অ্যাকসেস বা সেল সিগন্যাল এনকোডিং পদ্ধতি হলাে TD-SCDMA এবং TD-CDMA ।
  • উচ্চ স্পেকট্রাম কর্মদক্ষতা।
  • আন্তর্জাতিক রােমিং সুবিধা চালু হয়। 

তৃতীয় প্রজন্ম মােবাইল ফোনের সুবিধাসমূহ

১। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভয়েস এবং ডেটা স্থানান্তরিত হয়। 
২। গান শােনা, টিভি ও সিনেমা দেখা এবং চাহিদা অনুযায়ী ডাউনলােড করা যায়। 
৩। যে কোন সময় ইন্টারনেট ব্রাউজ করা যায়; ইন্টারনেটে গেম খেলা এবং গেম ডাউনলােড করা যায়। 
৪। ভিডিও কনফারেন্স (Video conferance) করা যায়। 
৫। সব সময় ইন্টানেট সংযােগ দেওয়া থাকে, আলাদা করে ইন্টারনেট সংযােগ দেওয়ার প্রয়ােজন হয় না। 
৬। বিকল্প পদ্ধতিতে বিল প্রদান সংক্রান্ত সেবা প্রদান করা যায়। যেমন-Pay-per-bit, pay-per-session, flat rate, symmatric bandwidth ইত্যাদি। 

উদাহরণ : UMTS (Universal Mobile Telecommunication Systern), IMT (International Mobile Telecorrifnunication) -2000, MC-CDMA,TD-SCDMA, EDGE, HSPA ইত্যাদি।

চতুর্থ প্রজন্ম (Fourth Generation-4G) 
আগামী দিনের মােবাইল ফোন সিস্টেম হলাে চতুর্থ প্রজন্মের মােবাইল ফোন সিস্টেম। এই প্রজন্মের মােবাইল সিস্টেমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলাে সার্কিট সুইচিং বা প্যাকেট সুইচিংয়ের পরিবর্তে ইন্টারনেট প্রটোকল (IP) ভিত্তিক নেটওয়ার্কের ব্যবহার। এর ফলে মােবাইল টেলিফোন সিস্টেমে ইন্টারনেট প্রটোকল (IP) ভিত্তিক নেটওয়ার্কের ব্যবহারের মাধ্যমে ডেটা আদান-প্রদান করা সম্ভব হবে। চতুর্থ প্রজন্মের মােবাইল ফোন সিস্টেমে আলট্রা-ব্রডব্যান্ড গতির ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাবে। দ্রুত চলনশীল ডিভাইসের ক্ষেত্রে এর ডেটা স্থানান্তর গতি ১০০ | মেগাবিট/সেকেন্ড এবং স্থির ডিভাইসের ক্ষেত্রে এর ডেটা স্থানান্তর গতি ১ গেগাবিট/সেকেন্ড। উদাহরণস্বরূপ, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন এবং অন্যান্য মােবাইল ডিভাইসের সাথে ইউএসবি ওয়্যারলেস মডেমের ডেটা স্থানান্তর। মােবাইল ওয়েব একসেস, আইপি টেলিফোনি, গেইমিং সার্ভিসেস, হাই-ডেফিনেশন মােবাইল টেলিভিশন, ভিডিও কনফারেন্সিং এবং থ্রিডি টেলিভিশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে এর প্রয়ােগ ক্ষেত্র হবে। নিম্নলিখিত সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে 4G এর বৈশিষ্ট্যগত উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। 

  • 4G এর গতি 3G এর চেয়ে প্রায় ৫০ গুণ বেশি। 4G এর প্রকৃত ব্যান্ডউইডথ ১০ এমবিপিএস আশা করা হচ্ছে। 
  • এ ত্রি-মাত্রিক ব্যবহারিক প্রয়ােগের ফলে কোন অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত না হয়েও নিজের উপস্থিতি আছে বলে অনুভূত হবে। সাইবার এবং প্রকৃত দুনিয়ার সাথে একীভূতভাবে লােক, জায়গা ও পণ্য পরস্পরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করতে সক্ষম হবে।
  • সহায়ক প্রযুক্তির মধ্যে মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধি পায়। যেমন ফোনের স্মার্ট কার্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রয়কৃত পণ্যের বিল প্রদান করতে সক্ষম হবে। 
  • 3G এর সীমাবদ্ধ ব্যান্ডউইডথ সমস্যার সমাধান 4G করবে। 
  • টেলিভিশনে অপেক্ষাকৃত উন্নত মানের ছবি এবং ভিডিও লিংক প্রদান করবে। 
  • আইপি নির্ভর ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক সিস্টেমে কাজ করবে। 

LTE (Long Term Evolution) হলাে সেলুলার স্ট্যান্ডার্ড ভিত্তিক একটি 4G মােবাইল সিস্টেম যা ৩২৬ মেগাবিট/সেকেন্ড পিক বিট রেট (Peak bit rate) প্রদান করে। এটি WiMax বা Flash-OFDM ওয়্যারলেস মেট্রোপলিটন এরিয়া নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি ভিত্তিকও হতে পারে যা মােবাইল ব্যবহারকারীদের ব্রডব্যান্ড ওয়্যারলেসে ২৩৩ মেগাবিট/সেকেন্ড গতিতে প্রবেশে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। 4G সিস্টেম পরিপূর্ণভাবে বর্তমান নেটওয়ার্কের স্থলাভিষিক্ত হবে এবং পরিপূর্ণভাবে নিরাপদ ইন্টারনেটে প্রবেশ করা যাবে বলে প্রত্যাশা করা যায়। এর ফলে ব্যবহারকারীগণ খুব সহজেই যে কোন সময় যে কোন জায়গায় পূর্বের জেনারেশনের তুলনায় অপেক্ষাকৃত দ্রুত গতিতে ডেটা, ভয়েস এবং মাল্টিমিডিয়া আদান প্রদান করতে সক্ষম হবেন। 

উদাহরণ : WiMax2, LTE (Long Term Evolution)-Advance ইত্যাদি।